এক সময় যেখানে হাজারো শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা, আজ সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। বিশাল সব উৎপাদন ভবনে নেই কোনো শ্রমিকের পদচারণা, নেই পাটের আঁশ থেকে সুতা তৈরির কর্মযজ্ঞ। বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে থাকা সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল এখন যেন রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর অপচয়ের এক নীরব প্রতীক। বন্ধ এই মিলের মরিচা ধরা মেশিন ও অব্যবহৃত যন্ত্রাংশ দেখভালে এখনো প্রতি মাসে সরকারের খরচ হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা।
সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের রায়পুরে প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা জাতীয় জুট মিলটি একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জেলার অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বারবার বন্ধ ও চালুর চক্রে পড়ে আজ প্রায় অচল হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মিলের বিশাল ভবনগুলো ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। উৎপাদন ইউনিটের ভেতরে পড়ে থাকা অসংখ্য মেশিনে ধরেছে মরিচা। কোথাও জমেছে ধুলার স্তর, কোথাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ। অথচ এসব রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য এখনো কর্মরত রয়েছেন ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

পরবর্তীতে ২০২২ সালের আগস্টে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ লিজ নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৪ সালের আগস্টে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে মিলের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
মিল বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। যাদের জীবন-জীবিকা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
কথা হয় মিলের সাবেক শ্রমিক রতন আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মিল যখন চালু ছিল তখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতাম। কখনো বেশিও হতো। সংসার ভালো চলত। মিলটি বন্ধ হওয়ার পর সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে ঘটকালি করছি। এখানেও তেমন ইনকাম না থাকায় পাশাপাশি সামান্য জমিতে কৃষি কাজ করে খুব কষ্টে সংসার চালাচ্ছি।

আরেক শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, এই জুট মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিলটি বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন কাজ করে বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনপাড় করছি। মিলটি চালু হলে আমরা যারা পুরাতন শ্রমিক আছি তাদেরকেই যেন কাজে নেওয়া হয় সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি।
আরেক শ্রমিক বলেন, যারা বড় বড় কর্মকর্তা রয়েছেন, তারা ঠিকই বেতন পাচ্ছেন। না খেয়ে মরছেন এর সাথে জড়িত শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের দুঃখ দেখার তো কেউ নাই৷ অন্য পেশাতেও সহজে কেউ যেতে পারছেন না৷
বর্তমানে মিল চালুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য নবকুমার কর্মকার বলেন, মিলটি চালু করতে আমরা বহু আন্দোলন করেছি। দলীয়করণ ও লুটপাটের কারণেই মিলটি বারবার বন্ধের মুখে পড়েছে এবং হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়েছে।
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) থেকে সিরাজগঞ্জের জাতীয় এই জুট মিলটি পরিচলানা হয়ে থাকে। বন্ধ থাকা মিলটি চালু করতে বিজেএমসি থেকে লিজের জন্য চেষ্টা চলছে। কেউ লিজ নিলেই আবার পুররায় মিলটি চালু হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্ধ থাকা মিলটি দেখভালের জন্য প্রায় ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। নিয়মিত সবার বেতনও পরিশোধ করা হচ্ছে। সবার বেতন বিদুৎ বিলসহ প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে আমরা আশা করছি খুব দ্রুত লিজের মাধ্যমে মিলটি চালু করতে পারবো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয়করণ এবং দীর্ঘদিনের লুটপাটের সংস্কৃতির কারণেই সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি বারবার ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তাদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় জুট মিল আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
শ্রমিকদেরও একই প্রত্যাশা। তাদের আশা, মরিচা ধরা মেশিনগুলো আবার সচল হবে, উৎপাদনের চাকা ঘুরবে, আর কর্মহীন হয়ে পড়া পরিবারের জীবনেও ফিরবে স্বস্তি।
নাজমুল হাসান/আরকে
