এক সময়ে অভাবের সংসার ছিল হাজিমুল ইসলামের। পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু আজ তিনি একজন স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা। তার কারখানায় তৈরি বাঁশ ও বেতের নান্দনিক পণ্য রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর চাহিদা মিটিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে।
হাজিমুল ইসলাম নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ঢেলাপীর এলাকার উত্তর সোনাখুলী ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা। নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আরিফুল হস্ত শিল্প’ নামে এক কারখানা।
হাজিমুল ইসলাম জানান, তার এই পথচলা সহজ ছিল না। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট আর উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়েছিল তার এই যাত্রা। অন্যের অধীনে কাজ করার সময় থেকেই নিজের কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন তিনি। একদিন মাথায় আসে বাঁশ দিয়ে নিত্য নতুন ও শৌখিন জিনিস তৈরির কথা। এরপর স্মার্টফোনে ইউটিউব ঘেঁটে বাঁশের পণ্য তৈরির কৌশল ও নকশা শেখা শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে নিজের বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে তৈরি করেন কয়েকটি পানির মগ। সেই মগগুলোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটি অনলাইন পেজে আপলোড করেন। প্রথম দিকেই অভাবনীয় সাড়া পান তিনি। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

হাজিমুল ইসলাম কেবল নিজেকেই স্বাবলম্বী করেননি, বরং এলাকার আরও ১৫ জন কর্মহীন মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন। বর্তমানে তার কারখানায় নিয়মিত কাজ করছেন ১৫ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক।
কারখানার নারী শ্রমিক মনোয়ারা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে ঘরে বসে সময় কাটত, অভাব লেগেই থাকত। এখন হাজিমুল ভাইয়ের কারখানায় কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়ে ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারেও অবদান রাখতে পারছি। আমাদের ভাগ্য বদলে গেছে।

শ্রমিক ববিতা রানি রায় বলেন, আমরা গরিব মানুষ। অভাবের সংসার কোনোমতে চলে। এখানে কাজ করে যা পাই সেটা দিয়ে সন্তানের পড়ালেখার সাহায্যের পাশাপাশি পরিবারের সাহায্য হয়।
উদ্যোক্তা হাজিমুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি আগে অন্যের বাড়িতে সিলিং তৈরির কাজ করে পরিবার চালাতাম। পরে কিছু করার ইচ্ছে থেকে ইউটিউব দেখে বাঁশের মগ তৈরি শুরু করি। সেখান থেকে আল্লাহর রহমতে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন আমার তৈরির পণ্য রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। এছাড়া বায়ারের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে যাচ্ছে। এখানে কাজ করে মাসিক প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার মতো আয় হয়। শুধু আমারই রোজগার নয় এখানে কাজ করে অনেকে পরিবার চালায়। তবে আমরা যারা এখানে কাজ করি আমাদের সরকারি প্রশিক্ষণসহ সুদমুক্ত লোনের ব্যবস্থা করলে পণ্য তৈরি বাড়ার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিসিক নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপ ব্যবস্থাপক নূরেল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সেখানের কর্মরত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। এছাড়া বিনাসুদে এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। সেখানে কীভাবে সহায়তা করলে তিনি লাভবান হয় সেটা করা হবে।
শাহজাহান ইসলাম লেলিন/আরকে
