ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের কার্পেটিং উঠে গিয়ে কোথাও ছোট, কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক।
সড়কের এমন বেহাল অবস্থায় প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। দুর্ভোগে পড়ছেন দূরপাল্লার যাত্রী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর হয়ে মেঘনা সেতু পর্যন্ত পুরো ২৫ কিলোমিটার পথে অসংখ্য স্থানে সড়কের পিচ উঠে গেছে। বিশেষ করে সাইনবোর্ড, চিটাগাংরোড, কাঁচপুর সেতুর ঢাল, চেঙ্গাইন, মদনপুর, কেওঢালা, লাঙ্গলবন্দ, সোনাখালী, দড়িকান্দি, টিপুর্দী, হাবিবপুর, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এবং মেঘনা টোল প্লাজা এলাকায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় গর্তের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না, যা দ্রুতগতির যানবাহনের চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক। প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে রাজধানীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, কক্সবাজার, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষ যাতায়াত করেন। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারও এ সড়ক ব্যবহার করে। ফলে সামান্য একটি গর্তও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক চালক গর্ত এড়াতে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন। এতে পেছনে থাকা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ভারী যানবাহন গর্তে পড়লে বিকট শব্দের সঙ্গে গাড়ি দুলে ওঠে। মোটরসাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কোথাও কোথাও বাস ও ট্রাককে ধীরগতিতে চলতে হওয়ায় দীর্ঘ যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আগে যেসব স্থানে ছোট গর্ত ছিল, সেগুলো এখন বড় আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকায় গর্তগুলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
পরিবহনচালক কবির মিয়া বলেন, মহাসড়কে এখন গাড়ি চালানো খুবই কষ্টকর। গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে রাতে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে গর্ত বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ ব্রেক করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এই সড়কে শুধু দুর্ঘটনার ভয় নয়, গভীর রাতে ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও থাকে। মহাসড়কের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাইপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। গর্তের কারণে গাড়ির গতি কমে গেলে অপরাধীদের তৎপরতার সুযোগ তৈরি হয়।
কবির মিয়ার অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একইভাবে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেই কার্পেটিং উঠে যায়। স্থায়ীভাবে উন্নতমানের নির্মাণকাজ না করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলে তিনি মনে করেন।
দাউদকান্দি থেকে চিটাগাংরোডগামী তিশা পরিবহনের যাত্রী সাইদুল ইসলাম বলেন, দিনের বেলায় কিছুটা সতর্ক হয়ে চলা যায়। কিন্তু রাতে মহাসড়কে চলাচল সত্যিই ভয়ের। গাড়ি হঠাৎ গর্তে পড়লে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ যাত্রায় এটি বড় ভোগান্তি।
প্রাইভেটকারচালক বেলায়েত হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে এখন গর্তগুলো অনেক গভীর হয়েছে। গাড়ির চাকা গর্তে পড়লে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় গাড়ির সাসপেনশন ও চাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কের এই অবস্থা দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন।
কয়েকজন ট্রাকচালক জানান, ভারী যানবাহন নিয়ে গর্তের ওপর দিয়ে চলাচল করলে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়রা জানান, মহাসড়কের পাশে অনেক স্থানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। পানি দীর্ঘ সময় সড়কের ওপর জমে থাকায় পিচ নরম হয়ে উঠে যাচ্ছে, এরপর ভারী যানবাহনের চাপে দ্রুত গর্ত তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, টানা বর্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যা— এই তিন কারণে সড়কের ক্ষতি বেশি হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়কের পাশের ঘাস ও ঝোপঝাড়ও পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, ফলে বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় সড়কের ওপর থাকছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে সংস্কারকাজ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা টেকসই হয় না। সাময়িকভাবে গর্তে খোয়া ও বিটুমিন ফেলে কাজ শেষ করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেই অংশ ভেঙে যায়।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি হলে মহাসড়কের ওপর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। পানি কার্পেটিংয়ের ফাঁক দিয়ে নিচের স্তরে প্রবেশ করলে রাস্তার ভিত্তি (বেজ ও সাব-বেজ) দুর্বল হয়ে যায়। এরপর ভারী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের চাপের কারণে কার্পেটিং উঠে গিয়ে দ্রুত খানাখন্দ তৈরি হয়। যেসব স্থানে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের ক্ষতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির সময় স্থায়ীভাবে কার্পেটিংয়ের কাজ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে প্যাচিং করা হচ্ছে, যাতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়। আবহাওয়া অনুকূলে এলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করা হবে বলে।
মেহেদী হাসান সৈকত/আরএআর
