বিজ্ঞাপন

বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, খাগড়াছড়িতে কৃষিতে ১১ কোটি টাকার ক্ষতি

বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, খাগড়াছড়িতে কৃষিতে ১১ কোটি টাকার ক্ষতি

সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি নেমে গেলেও খাগড়াছড়িজুড়ে এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠজুড়ে এখন পচা কাদাপানির গন্ধ, মরে পড়ে আছে মরিচ, বেগুন, শসা, বরবটি ও অন্যান্য সবজির গাছ। কোথাও খালি মাচা, কোথাও কাদায় ঢেকে আছে আবাদি জমি। কষ্টের ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার ৩৪৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ২৩৩ হেক্টর কৃষিজমির ফসল সম্পূর্ণ এবং ১৯৩ হেক্টরের বেশি জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষি খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান এবং গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির আবাদ। বন্যার পানি নেমে গেলেও অনেক জমি এখনো কাদায় ঢেকে থাকায় নতুন করে আবাদ শুরু করতে পারছেন না কৃষকরা। মাটিরাঙ্গা, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি ও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে পচা কাদাপানির দুর্গন্ধ। অধিকাংশ সবজি খেতের গাছ মরে গেছে। কোথাও শুধু বাঁশের খালি মাচা দাঁড়িয়ে আছে। অনেক কৃষকের জন্য চাষাবাদই ছিল সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস।

মেরুং ইউনিয়নের সোবাহানপুর এলাকার কৃষক মো. রহমত আলী জানান, এক একর জমিতে মরিচ, ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন। বেগুনের ফলন শুরু হওয়ার পরই বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে যায়। এখন জমিতে মৃত গাছ ছাড়া কিছুই নেই। এতে অন্তত ১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।

একই এলাকার কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন কৃষিকাজ। এ বছর আড়াই বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন। বন্যার আগে কিছু সবজি বিক্রি করতে পারলেও বন্যায় সব ভেসে গেছে। জমির ওপর প্রায় এক ফুট পলি জমে থাকায় নতুন করে আবাদ করাও সম্ভব হচ্ছে না। পরিবার চালাতে এখন ঋণ নেওয়া ছাড়া উপায় দেখছেন না তিনি।

ছোট মেরুং বাজার-সংলগ্ন এলাকায় ৬০ শতক জমিতে বরবটি, ঢেঁড়স, শসা ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন কৃষক আবাদুল বাতেন। তিনি জানান, প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে চাষ করেছিলেন। ফলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যার পানিতে সব গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করে সংসার চলত। এখন সেই আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, দীঘিনালা এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ফসলের প্রায় ১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শেষে পুনর্বাসন ও কৃষি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। আপাতত কিছু কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ফসলভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১১ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সবজির বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হবে। আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্যও বিশেষ সহায়তার চেষ্টা চলছে।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষি ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু না হলে চলতি মৌসুমের উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অনেক কৃষক নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে পারবেন না।

বন্যার পর মেরুং ইউনিয়নের বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের একটি স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, তালছড়ি এলাকায় একটি পাহাড়ের অল্প অংশ কেটে পানি চলাচলের পথ তৈরি করা গেলে মেরুং এলাকায় বন্যার প্রকোপ অনেকাংশে কমে আসবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক ফুট প্রশস্ত ওই পাহাড়ের অংশের কারণে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানি আটকে থাকে এবং প্রতিবছর বন্যার সৃষ্টি হয়। তাই ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মোহাম্মদ শাহজাহান/এএমকে

বিজ্ঞাপন