সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুটি মামলার তদন্ত দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত।
আদালতে দাখিল করা লিখিত ব্যাখ্যায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আসামিদের করা পৃথক দুটি রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। সেই আদেশ কার্যকর থাকায় তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে এবং আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দাখিল করা তদন্তকারী কর্মকর্তার পৃথক দুটি লিখিত ব্যাখ্যা এবং আদালতের সংশ্লিষ্ট নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
দুদকের লিখিত ব্যাখ্যা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ মার্চ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত স্পেশাল মামলা নম্বর-০৩/২০২৩ এবং স্পেশাল মামলা নম্বর-০৬/২০২৪-এ দীর্ঘদিন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কারণ ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেন। আদালতের ওই নির্দেশের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করা হয়।
লিখিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রথম মামলাটি ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঠাকুরগাঁও থেকে দুদক আইন- ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় দায়ের করা হয়। মামলায় ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (শিক্ষা শাখা) অফিস সহকারী এবং বর্তমানে হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। পরে মামলাটি স্পেশাল মামলা নম্বর-০৩/২০২৩ হিসেবে বিচারাধীন হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে জানান, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ, নথি যাচাই এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিলেন। তবে তদন্ত চলাকালে শহীদুল ইসলাম মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর-৩১০/২০২৪ দায়ের করেন। ওই রিটের শুনানি শেষে একই বছরের ১৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করেন এবং দুদকের নোটিশসহ স্পেশাল মামলা নম্বর-০৩/২০২৩-এর সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
পরে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং ৩১ জুলাই ২০২৪ তারিখে পৃথক নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হাইকোর্টের আদেশ অনুসরণ করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
অপরদিকে দ্বিতীয় মামলাটি ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর একই আইনে দায়ের করা হয়। এতে শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। পরে এটি স্পেশাল মামলা নম্বর-০৬/২০২৪ হিসেবে আদালতে বিচারাধীন হয়।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দ্বিতীয় মামলার তদন্তও স্বাভাবিক নিয়মে চলছিল। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের একপর্যায়ে মোছা. কামরুন নাহার মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনায় জানানো হয়, হাইকোর্ট বিভাগ রিটের প্রেক্ষিতে মামলার সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে রুল জারি করেছেন। এরপর থেকে দ্বিতীয় মামলার তদন্ত কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা তার লিখিত ব্যাখ্যায় আরও উল্লেখ করেন, দুটি মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়মিতভাবে মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে দুদকের প্রধান কার্যালয়কে জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি বছরের ৩১ মার্চ মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন), দুদক প্রধান কার্যালয় বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে হাইকোর্টে বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকা মামলাগুলোর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে প্রয়োজনীয় আইনগত উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা রিটগুলোর নিষ্পত্তি এবং কমিশনের অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
তবে দুই মামলার আসামি শহীদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের ঠাকুরগাঁও সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আসামিপক্ষের করা রিটের কারণে হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশ এখনো বহাল রয়েছে। ফলে তদন্ত কার্যক্রমও স্থগিত আছে। রিটের নিষ্পত্তি হয়ে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম.এম. সফিউজ্জামান সুমন বলেন, মামলা দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হলেই কার্যক্রম চালানো যাবে।
এর আগে শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে জমি কেনার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর সেই জমি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করেন তিনি। এ ছাড়া সরকারের টিসিবির পণ্য প্যাকেটজাতকরণে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন শহীদুল। হঠাৎ এত সম্পদের মালিক হওয়ায় শহরজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সামান্য বেতনের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও তিনি ঠাকুরগাঁও শহরের বড় মাঠের পাশে আলিশান বাড়ি নির্মাণ করছেন বলে জানা গেছে।
রেদওয়ান মিলন/আরএআর
