একটু বৃষ্টি নামলেই বন্ধ হয়ে যায় পাঠদান। হঠাৎ কালো মেঘ জমলেই বই-খাতা গুটিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। আবার প্রচণ্ড রোদে খোলা আকাশের নিচেই চলছে ক্লাস। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মিনাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
একটি নতুন ভবনের অভাবে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে। দীর্ঘদিন ধরে ভবন সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় খোলা আকাশের নিচেই চলছে পাঠদান। প্রচণ্ড রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও বাধ্য হয়ে খোলা স্থানে ক্লাস করতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। বৃষ্টি শুরু হলেই ভিজে যায় বই-খাতা ও শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় পাঠদান বন্ধ রেখে বাড়ি ফিরে যেতে হয় তাদের।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে সরকারিভুক্ত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরোনো ভবন ২০২১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৪ সালে ভবনটি নিলামে বিক্রি করে অপসারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে মাত্র দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর পাঠদান সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাকি তিনটি শ্রেণির ক্লাস বিদ্যালয়ের বারান্দা ও খোলা আকাশের নিচে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে বর্ষাকালসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি আবুল কালাম বলেন, এই বিদ্যালয় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৩ সালে সরকারিভুক্ত হয়। আগে বিদ্যালয়ে মোট তিনটি ভবন ছিল। বর্তমানে দুটি ভবন থাকলেও সেখানে মাত্র দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। তিন কক্ষবিশিষ্ট যে ভবনটি ছিল, সেটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পর কর্তৃপক্ষ তা অপসারণ করে। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীদের বারান্দা ও খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন, দ্রুত তিন কক্ষবিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের একটি নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
অভিভাবক সাদ আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, রোদ, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে হচ্ছে। এতে তারা যেমন কষ্ট পাচ্ছে, তেমনি লেখাপড়াও ব্যাহত হচ্ছে। আমরা চাই, দ্রুত একটি নতুন ভবনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে শিশুদের স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা যায়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা খাতুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি যখন এই বিদ্যালয়ে যোগদান করি, তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সাড়ে তিনশর বেশি এবং শিক্ষক ছিলেন ১০ জন। সে সময় ভবনটি ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। পরে সরকার ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলে সেখানে আর পাঠদান সম্ভব হয়নি। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বর্তমানে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী রয়েছে। এখন শ্রেণিকক্ষের অভাবে খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নিতে হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়, পাঠদান বন্ধ করে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়। এই মুহূর্তে বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন ভবন অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য একাধিকবার স্থানীয় সংসদ সদস্য, সচিবালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পূর্বের ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ামাত্রই নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি বর্তমান ঝড়-বৃষ্টির দুর্ভোগ থেকে শিক্ষার্থীদের সাময়িক সুরক্ষা দিতে আলাদাভাবে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সেই বরাদ্দের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য টিনশেড নির্মাণ করে পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হবে।
আরএআর
