২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন ও অন্যায়ের প্রতিবাদে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সামনে আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি চালানোর সেই দৃশ্য দেখেছে বিশ্ববাসী।
চব্বিশের এই বীরের আত্মত্যাগে জ্বলে ওঠা আন্দোলনের দাবানল শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনার দমননীতি উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার ক্রোধ ও ক্ষোভের দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিণত হয় অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। ত্বরান্বিত হয় দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসনের অবসান। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তোপের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ‘মাদার অব ফ্যাসিজম’ খ্যাত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা।
ঐতিহাসিক সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ শহীদ আবু সাঈদ। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগে দুই হাত প্রসারিত করে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন দেশজুড়ে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের আজ ৭৩০ দিন, অর্থাৎ দুই বছর।
এরই মধ্যে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো রায় কার্যকর হয়নি।
জুলাইয়ের মহাবিপ্লবী শহীদ আবু সাঈদের মা-বাবার চাওয়া- জীবদ্দশায় দায়ী পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যাওয়া। একই চাওয়া তার সহপাঠী ও জুলাইযোদ্ধাদের। যদিও রায় কার্যকর হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের বড় ভাই। দাবি উঠেছে, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের ইতিহাস যেন দলীয়করণে ম্লান না করা হয়। অতীতের মতো যেন না হয় রাজনীতি, সঠিক ইতিহাসে যেন ঠাঁই পান আবু সাঈদ।
১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যুই অভ্যুত্থানের ‘টার্নিং পয়েন্ট’
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জড়ো হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পার্ক মোড়ে। সেখানে আগে থেকেই তৎকালীন সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরাসহ মারমুখী মনোভাবে অবস্থান নেওয়া পুলিশের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
এর আগের দিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এদিন আবারও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।
১৬ জুলাই, দুপুর ২টা ১৩ মিনিট। পার্কের মোড়ে শিক্ষার্থীদের স্লোগান, পুলিশের টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ তার মধ্যে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়ে কালো টি-শার্ট পড়া এক যুবক। তিনি হলেন আবু সাঈদ। কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশের গুলিতে সড়কে লুটিয়ে পড়েন। আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে পুলিশের ছোড়া গুলি করার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় আবু সাঈদের প্রাণ প্রদ্বীপ। সেইদিন ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় রংপুরে আবু সাঈদসহ সারাদেশে অন্তত ছয়জন নিহত হন।
এসব হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নতুনমাত্রা যোগ হয়। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে জাগ্রত করে তোলে। দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।
জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। তার মৃত্যুই ছিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’। যা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করে।
আবু সাঈদকে বাঁচাতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আয়ান
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ১৬ জুলাই আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরপরই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন সিয়াম আহসান আয়ান। আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সেদিনের ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনিই আবু সাঈদকে বাঁচাতে হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে কারমাইকেল কলেজে অনার্সে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুলিশের আক্রমণে সবাই সরে যাওয়ার সময় আবু সাঈদ ভাই পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে এসে দাঁড়ান। বুক টান করে হাতটা দুই দিকে ছড়িয়ে দেন। সে সময় পুলিশ ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। আমি তার থেকে ২০ হাত দূরে ছিলাম। আমি খেয়াল করলাম আবু সাঈদ ভাইকে রেখে সবাই চলে যাচ্ছে। তখনো আমি আবু সাঈদ ভাইকে চিনতাম না, শুধু মাইকে তার নাম শুনেছি। আমার মনে হলো, ভাই কারও সন্তান, কারও ভাই। তার জায়গায় যদি আমি থাকতাম, তখন যদি আমাকে কেউ একা ফেলে যেত। এরপর আমি যত দ্রুত সম্ভব ভাইকে বাঁচাতে তার দিকে ছুটে যাই। যদি আর কিছুক্ষণ আগে আসতাম, হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম।
সিয়াম আহসান আয়ান আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আবু সাঈদ ভাই রোড ডিভাইডারটা ক্রস করে মাটিতে বসে পড়েন, আমি তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করি। ওই সময়টাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে থেকে হেলমেট পরিহিত একজন পুলিশ অফিসার সাঈদ ভাইয়ের দিকে পিস্তল তাক করেছিলেন। আমি সে সময় শেষ চেষ্টাটা করলাম। আবু সাঈদ ভাইকে গুলি থেকে বাঁচাতে আমি তাকে বাম পাশে নিলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে গুলিটা এসে লাগল আমার হাতের ডান পাশে। তখন সাঈদ ভাই একেবারে পড়ে যান। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে তিনি বললেন, ‘আমাকে বাঁচাও।’ এরই মধ্যে অন্যরাও এগিয়ে এসে ভাইকে রিকশায় করে মেডিকেলে নিয়ে যান। আমি সে সময় স্পটেই অবস্থান করছিলাম।

তরুণ এই শিক্ষার্থী বলেন, আমরা আন্দোলন করেছিলাম কোটা সংস্কার করার পাশাপাশি দেশের শাসনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য। আমি চেয়েছিলাম যেন আর অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য না থাকে, অপরাধী যত বড়ই হোক যেন বিচার হয়। আমাদের সেই উদ্দেশ্য-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে আমাদের কষ্টের ফসল আমরা পাইনি। দেশের ছাত্র-জনতা এখনো সেই আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এ কারণে যদি আবার কোনো যৌক্তিক আন্দোলন হয়, তাহলে এবার আবু সাঈদ ভাইয়ের মতো সামনের সারিতে থেকেই দেশের জন্য শহীদ হতে চাই।
সেদিন দুবার গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ
দুই হাত প্রসারিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সামান্য পিছু হঠলে আবারও গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গত বছরের ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে এমনটিই উল্লেখ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম নেতা ইমরান আহমেদ।
তিনি বলেন, ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। ওই সময় খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে পুলিশ। প্রথম গুলি খাওয়ার পর সামান্য একটু পিছিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু আবারও গুলিবিদ্ধ হন। তখন সড়কের বিভাজক (ডিভাইডার) পার হয়ে একটু পেছনে আসেন। আরেকটু পেছনে থাকা আয়ান এগিয়ে এসে আবু সাঈদকে ধরেন। এরপর একটু সরে যাওয়ার পর সাজু রায়সহ আরও কয়েকজন মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এক ঘণ্টা পর তার মৃত্যুর খবর পাই আমরা।
প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক একটি তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে শহীদ হন এবং ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- সঠিক ময়নাতদন্ত না হওয়া সত্ত্বেও নথিপত্র অনুযায়ী ক্ষত ও সম্পর্কিত ভিডিও ফুটেজ এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে যে আবু সাঈদকে কমপক্ষে দুটি প্রাণঘাতী ধাতব গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- আবু সাঈদ পুলিশের ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ দুই হাত মেলে বুক পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বিপরীত পাশের মাত্র ১৪ থেকে ১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের সাজা
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এ বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলায় সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন- পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকরকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি আসামিদের দোষী সাব্যস্তক্রমে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আমরা সবাই বেঁচে আছি, শুধু আবু সাঈদ নেই
আবু সাঈদরা ছিলেন ৯ ভাইবোন, ছয় ভাই এবং তিন বোন। ভাই-বোনদের মধ্যে আবু সাঈদ সবার ছোট ছিলেন এবং পরিবারের একমাত্র সন্তান, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই ভাইকে হারানোর শোক এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তার ভাইবোনদের।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিল আবু সাঈদ। আমরা সব ভাইবোন বেঁচে আছি, অথচ আমার ছোট ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। এটা তো আমাদেরকে কাঁদায়, ভাই হারানোর কষ্ট মনের মধ্যে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। কিন্তু এটা ভেবে ভালো লাগে, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শত শত বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, গুমের শিকার মানুষ মুক্তি পেয়েছে, বাকস্বাধীনতা পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে যারা জীবন দিয়েছেন, হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের এই আত্মত্যাগ যেন রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ ভুলে না যায়। তাদের আত্মত্যাগের চেতনাকে লালন ও ধারণ করতে হবে। আমরা চাই আবু সাঈদসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্রুত বিচার হোক, মামলার রায় কার্যকর করা হোক। সকল শহীদ ও আহতদের পরিবারসহ জুলাইযোদ্ধারা যেন ন্যায়বিচার পায়।
ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে হবে দাবি করে আবু হোসেন আরও বলেন, আবু সাঈদকে পুলিশ কীভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্ববাসী দেখেছে। সবকিছুর প্রমাণ থাকার পরও দীর্ঘসূত্রতায় আবু সাঈদ হত্যা মামলার বিচারকাজ ও রায় প্রদানে কালক্ষেপণ করা হয়েছে। এখন আসামিদের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আমরা জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করেছিলাম, কিন্তু তা করা হয়নি। আবু সাঈদের বেলায় যদি এমন হয়, তাহলে যাদের তথ্য-প্রমাণ নেই কিন্তু শহীদ কিংবা আহত হয়েছেন, তারা তো বিচার পাবেন বলে মনে হয় না। অথচ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এটি বর্তমান সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আবু সাঈদের স্মৃতিসংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রমের উদ্যোগ নিলেও দুই বছরেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তোরণ, জাদুঘর, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও সে পর্যন্তই যেন শেষ কার্যক্রম। এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্পের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। বর্তমানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মহানায়কের স্মৃতিসংরক্ষণে ভিত্তিপ্রস্তরের ফলকসহ তার স্মৃতিচিহ্ন কেবল অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে।
বেঁচে থাকতেই রায় কার্যকর দেখতে চান আবু সাঈদের অসুস্থ বাবা
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৬ জুলাই আমার ছেলে সকালে ভাতও খায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে মিছিলে যায়। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেয়। কিছু নির্দিষ্ট পুলিশ সদস্য আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। আমরা সেই ভিডিও পরে টেলিভিশনে দেখেছি। এর আগে মানুষের মুখে মুখে শুনেছি আবু সাঈদ মারা গেছে। এটা শোনার পর আমার দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যায়। আমরা লাশ আনতে রংপুর গিয়ে শুনতে পাই, পুলিশ লাশ গুম করেছে। হাসপাতালের মর্গে আমার ছেলেকে একবারের জন্যও দেখতে দেয়নি। ছাত্ররা মেডিকেল থেকে লাশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের কাছ থেকে লাশ কেড়ে নিয়ে মারধর করে।
তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে ১৬-১৭টা গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে গ্রামে লাশ আনে প্রশাসন। তারা আমাকে ওই রাতেই লাশ দাফন করার জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। পরে আমরা সকাল ৯টার দিকে লাশটা দাফন করি। দেরি হওয়ায় পুলিশ আমাদের বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে, ভয় দেখায়। আমি বিচার দেখতে চাই। হত্যা মামলায় যে রায় হয়েছে, তা আমি বেঁচে থাকতে দেখে যেতে চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে।
অসুস্থ শরীরে কাঁপা কণ্ঠে মকবুল হোসেন আরও বলেন, শেখ হাসিনা টিভিতে বলেছিলেন- মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের চাকরি দেবেন না তো রাজাকারের ছেলেদের চাকরি দেবেন? তার ভাষায়, মুক্তিযোদ্ধা যদি এক কোটি হন, তাহলে বাকি ১৫ কোটি মানুষ সবাই রাজাকার—এই বক্তব্যে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
কবরের দিকে তাকালে ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভাসে
শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার ছেলে বাড়িতে এলে সবার খোঁজখবর নিত। বোনদের শ্বশুরবাড়িতে যেত, তাদের পছন্দের ফলমূল-খাবার কিনে আনত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এলে সবার আগে আমাকে ডাকত, জড়িয়ে ধরত, কথা বলে খোঁজ নিত। রংপুরে থাকলে ফোন দিয়ে কথা বলত। ওর সঙ্গে বাড়ির সবার ভালো সম্পর্ক ছিল। সবার আদরের ছেলে ছিল আবু সাঈদ। সেই ছেলে আমার নেই। এখন আর কেউ ফোন করে বলে না, মা কেমন আছো। আমার ছেলে নেই, কত কষ্ট যে বুকে চাপা দিয়ে আছি, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

তিনি আরও বলেন, আমার মতো অনেক মা সন্তান হারিয়েছেন। আমার কষ্ট তাদের কষ্ট একই। আমি বেঁচে থাকতে সেই কষ্ট কমাতে চাই। আমার ছেলের হত্যাকারী পুলিশদের ফাঁসি দেখতে চাই। শুধু আমার আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচার করলে হবে না, সরকারকে সকল শহীদের মায়ের কষ্ট বুঝতে হবে, সকল হত্যার বিচার করতে হবে। আমি যখন ছেলের কাপড়গুলো দেখি, বই-খাতা দেখি, তখন বুকটা ফেটে যায়। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। ছেলের ব্যবহারের সবকিছু আছে, শুধু আমার কলিজার টুকরা আবু সাঈদ নেই। কবরের দিকে তাকালে ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভাসে।
আবু সাঈদের আত্মত্যাগ সবকিছুতেই ‘টার্নিং পয়েন্ট’
জুলাই আন্দোলনে রাজপথে থাকা রংপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংগঠক জোবাইদুল ইসলাম বুলেট ঢাকা পোস্টকে বলেন, জুলাই বিপ্লবে শাসকগোষ্ঠীর বন্দুকের সামনে আবু সাঈদের দাঁড়ানোর যে সাহসী ভূমিকা ও আত্মত্যাগ, তা কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তার বীরোচিত আত্মত্যাগ গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। ক্ষমতার পালাবদলে মসনদে বসে আবু সাঈদকে ভুলে গেলে আবার আবু সাঈদরা জেগে উঠবেন। বৈষম্য, দুর্নীতি, অনিয়ম, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, লুটপাট, গণহত্যা, খুন, গুম, ধর্ষণ, বঞ্চনা, দলীয়করণ— সবকিছুর বিরুদ্ধে আবু সাঈদ অনুপ্রেরণা। তার আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি বিপ্লবী, প্রতিবাদী ছাত্র-জনতার হৃদয়ে গেঁথে আছে এবং থাকবে। দল, মত ও আদর্শে পার্থক্য থাকলেও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা, চেতনা ও প্রত্যাশাকে যারা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, তারাই শহীদ আবু সাঈদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু আবু সাঈদ নয়, জুলাইয়ের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে। শুধু রায় দিয়ে চুপ করে থাকলে হবে না, তা যেন সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের প্রতি মানুষ আগের মতোই আস্থাহীনতায় থাকবে। সরকারকে এসব বিষয়ে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই না এলে, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের বিরল মুহূর্ত ছড়িয়ে না পড়লে আজ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলতে কিছুই বলা যেত না।
এই আইনজীবী আরও বলেন, মানুষ কাউকে বিশ্বাস করতে চায়, আস্থা রাখতে চায়। কিন্তু সেই বিশ্বাস-আস্থা নিয়ে যদি কেউ খেলা করে, শাসনের নামে শোষণ করে, তাহলে তার পরিণতি কী হয়— সেই ইতিহাসই জুলাই গণঅভ্যুত্থান। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৫৫ বছরে যেসব অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম গণঅভ্যুত্থান ‘৩৬ জুলাই’ এর বিপ্লব। এই ইতিহাসের মহানায়ক আবু সাঈদ।
আরএআর
