ভোরের আলো ফোটার আগেই বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে নিজের বাম পায়ে সাপোর্ট বেল্টটি শক্ত করে বাঁধেন তরুণ খন্দকার। এরপর ধীরে ধীরে উঠে বসেন একটি ইজিবাইকের চালকের আসনে। কয়েক কিলোমিটার পথ চালানোর পরেই কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে তার। মাঝেমধ্যে গাড়ি থামিয়ে স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে কিছুক্ষণ নিথর হয়ে বসে থাকতে হয় তাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিশ্রামের সুযোগ নেই তার, কারণ, বাবা হারানো ছয় সদস্যের অসচ্ছল পরিবারের যাপিত জীবন এখন অনেকটাই নির্ভর করে তার এই সামান্য আয়ের ওপর।
আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে এই তরুণের হাতে ছিল বই খাতা। চোখে ছিল পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের অভাব দূর করার একরাশ রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি রক্তঝরা দুপুর সেই স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথে পুলিশের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয় তার শরীর। অস্ত্রোপচার, দেশ বিদেশে দীর্ঘ চিকিৎসা সব পেরিয়েও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শরীরে এখনো বহন করে চলেছেন সেই দিনের বুলেটের নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি।
ব্যক্তিগত পরিচিতি ও আন্দোলনের পটভূমি
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিরকেদা ইউনিয়নের জোগাড়পাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. তরুণ খন্দকার। প্রয়াত ফিরোজ খন্দকারের ছেলে তিনি। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সময় তরুণ বিরকেদা নূরানী হাফেজিয়া মাদরাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরু থেকেই দেশের পরিবর্তনের এক গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল তার মনে।
আন্দোলনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তরুণ খন্দকার বলেন, ৩ আগস্ট রাতে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিই, দেশের এই অবস্থায় আর ঘরে বসে থাকা যায় না। বৈষম্যের বিরুদ্ধে যখন সবাই রাজপথে নেমেছে, তখন আমাদেরও যেতে হবে। জানতাম ঝুঁকি আছে, কিন্তু এত বড় মূল্য দিতে হবে, সেটা কখনো ভাবিনি।
৪ আগস্ট, যেভাবে থমকে গেল জীবনের গতি
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, রোববার। সকাল থেকেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল দুপচাঁচিয়া উপজেলায়। সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী একটি বিশাল মিছিল নিয়ে থানা মোড়ের দিকে রওনা হন। স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১১টা ১৫ মিনিটে মিছিলটি দুপচাঁচিয়া থানার সামনে পৌঁছালে পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে ছাত্র জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং চারদিকে শুরু হয় ছোটাছুটি আর আর্তনাদ।
সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা নূর ইসলাম বলেন, আমরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। হঠাৎ করেই পুলিশ গুলি শুরু করে। সবাই জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে থাকে। হঠাৎ দেখি এক তরুণ রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে আছে। তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আমি ও আরও কয়েকজন মিলে তাকে দ্রুত কোলে তুলে একটি রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠাই। আর কয়েক মিনিট দেরি হলে হয়তো ছেলেটাকে বাঁচানোই যেত না।
সেদিনের সেই নারকীয় গুলিবর্ষণে তরুণের শরীরে একটি গুলি বিদ্ধ হয়। বুলেটটি তার পেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বাম পায়ের প্রধান রগ ও স্নায়ু ছিঁড়ে বের হয়ে যায়। ওই দিনের ঘটনায় দুপচাঁচিয়াতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন, পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয় এবং তরুণের মতো গুলিবিদ্ধ হন অন্তত ১০ জন।

চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব
গুলিবিদ্ধ তরুণকে প্রথমে দুপচাঁচিয়া ইসলামী হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসার পর অবস্থার আরও অবনতি হলে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে সরকারি উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে থাইল্যান্ডেও পাঠানো হয়।
তবে থাইল্যান্ডের চিকিৎসকরা জানান, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছিঁড়ে যাওয়া স্নায়ু ও রগ আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
চিকিৎসকদের সেই নির্মম বার্তার কথা উল্লেখ করে তরুণ বলেন, বিদেশের ডাক্তাররাও বলেছিলেন, যদি আরও আগে নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো কিছুটা আশা ছিল। এখন আর আমার পা পুরোপুরি ভালো হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
বর্তমান বাস্তবতা ও প্রতিদিনের নতুন যুদ্ধ
বর্তমানে বিশেষ মেডিকেল সাপোর্ট বেল্ট ছাড়া এক কদমও হাঁটতে পারেন না তরুণ। কয়েক মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকলে অবশ হয়ে আসে পা, শুরু হয় অসহ্য যন্ত্রণা। অষ্টম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তার, চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে মাদরাসার বারান্দায় যাওয়া।
তরুণের বাবা অনেক আগেই মারা যাওয়ায় মা ও ভাইবোনসহ পরিবারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণের দায়িত্ব এখন এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই তরুণকে টানতে হচ্ছে। ইজিবাইক চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে দিন কাটছে তাদের।
চোখের জল মুছতে মুছতে তরুণের মা মোছা. সাহিদা বেগম বলেন, আমার ছেলেটা আগে সারাদিন দৌড়াত, খেলত, পড়াশোনা করত। এখন কয়েক কদম হাঁটলেই ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। একজন মা হিসেবে চোখের সামনে সন্তানের এই কষ্ট দেখার চেয়ে বড় আজাব আর কিছু নেই। ওর চিকিৎসার জন্য যা ছিল সব শেষ করেছি। এখন আর আমাদের কোনো সামর্থ্য নেই। সরকারের কাছে একটাই আবেদন, আমার ছেলেটার স্থায়ী চিকিৎসা আর একটা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিন।
রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও প্রাসঙ্গিক বক্তব্য
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী প্রজনন শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা এককালীন আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন তরুণ। এছাড়া বর্তমানে তিনি নিয়মিত মাসিক ২০ হাজার টাকা করে সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। তবে পরিবারের দাবি, এই দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের তুলনায় এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়।
তরুণের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিরকেদা নূরানী হাফেজিয়া মাদরাসার শিক্ষক আব্দুস ছামাদ বলেন, তরুণ অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছাত্র ছিল। একটি গুলি তার পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। রাষ্ট্রের উচিত তরুণের মতো আহত যোদ্ধাদের আজীবন চিকিৎসা ও স্থায়ী সম্মানজনক পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়া।
এই বিষয়ে দুপচাঁচিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। ভবিষ্যতে সরকারি বিধি মোতাবেক তার পরিবারকে আরও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।
করুণা নয়, সম্মান চান তরুণ
দুই বছর আগে রাজপথে যে বুলেটের আঘাত তরুণ খন্দকারের শরীরকে বিদ্ধ করেছিল, সেটি শুধু তার মাংসপেশি ক্ষতবিক্ষত করেনি বরং তার কৈশোর, শিক্ষা এবং একটি স্বাভাবিক জীবনের সম্ভাবনাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে। ইতিহাস হয়তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নাম স্বর্ণাক্ষরে স্মরণ রাখবে, কিন্তু তরুণের মতো বেঁচে থাকা আহত যোদ্ধাদের এই দীর্ঘ, নীরব এবং প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধও সেই ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে রাষ্ট্রের কাছে তরুণের শেষ আকুতি, দেশের জন্য রাজপথে নেমেছিলাম। আজ নিজের পরিবারের জন্য লড়াই করছি। আমি কারও করুণা চাই না। শুধু চাই উন্নত চিকিৎসা ও একটা স্থায়ী সম্মানজনক কাজ, যাতে পঙ্গু শরীর নিয়েও সম্মানের সঙ্গে পরিবারটা চালাতে পারি।
আব্দুল মোমিন/এসএইচএ
