৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে মোহাম্মদ আলী তার খালাতো ভাই মিরাজসহ রাজপথের মিছিলে যোগ দেন। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আসামাত্রই পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলীসহ অনেকে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কাতরাতে কাতরাতে মাথা তুলে তিনি দেখতে পান, একটু দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন তার খালাতো ভাই মিরাজ। রক্তের স্রোত দেখে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মোহাম্মদ আলী। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখতে পান- চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে আছেন এক হাসপাতালের বেডে।
মোহাম্মদ আলী জীবিকার তাগিদে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আহত অবস্থায় তার খালু ও মিরাজের বাবা মো. আব্দুস সালাম দুই ভাইকে মাইক্রোবাসযোগে নিয়ে আসেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট মিরাজ মৃত্যুবরণ করেন। তবে দীর্ঘ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর প্রাণে বেঁচে যান লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের মমিনুল মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী (২০)।
মোহাম্মদ আলীর (২০) বাবা মমিনুল মিয়া অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান। আগে বাবা-ছেলে দুজনের উপার্জন থাকলেও এখন উপার্জন হয় একজনের। বাবা মমিনুল মিয়ার সারা দিনের কষ্টের উপার্জন চারশ থেকে পাঁচশ টাকা, যা দিয়ে পরিবারের চার সদস্যের সংসার খরচ ও ওষুধ কেনার ব্যয় মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়।
জুলাই আন্দোলনে আহত মোহাম্মদ আলী বলেন, বেঁচে আছি, কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা নিজের কাছে সংসারের বোঝা মনে হয়। আমি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারি না, কোমরের রগে সমস্যা হয়েছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকার চেক দিয়েছিল, এখন মাসে মাসে ১০ হাজার টাকা করে পাই, যা নিজের ওষুধ কেনা ও চিকিৎসা খরচেই শেষ হয়ে যায়, পরিবারের জন্য কিছু করতে পারি না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাবো, আমার উন্নত চিকিৎসাসহ জুলাইযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
মোহাম্মদ আলীর বাবা মমিনুল মিয়া বলেন, আমার ছেলের চিকিৎসায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনো আমার ছেলে পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, তার ওঠাবসায় অনেক সমস্যা হয়। চিকিৎসক বলেছেন তার উন্নত চিকিৎসার দরকার। ভিটেবাড়ি ছাড়া আমার আর কিছু নেই। আমি সরকারের কাছে দাবি করি, আমার ছেলেকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হোক এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস আলী বলেন, মোহাম্মদ আলী ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি, কোনো কাজ করতে পারেন না, ওঠাবসা করতে তাঁর অনেক কষ্ট হয়। আমরা চাই, জুলাই আন্দোলনে তাঁর মতো সব আহতের সরকারিভাবে উন্নত চিকিৎসাসহ আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
ভাদাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা জুলাই আন্দোলনে আহত মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখি। আমাদের সরকার জুলাই আন্দোলনে আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। কাউকে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে হলে আমাদের সরকার সেই ব্যবস্থাও করবে।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়া মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তার একটি আবেদনও পেয়েছি। তার চিকিৎসার বিষয়ে আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
আরএআর
