এক তরুণ উদ্যোক্তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চিলতে বিষাদ আর মায়ের প্রতি গভীর টান। বলছিলাম টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা আল-আমিনের (২৮) কথা। যার এই সফলতার গল্পটি শুরু হয়েছিল এক বুক কান্না আর মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে।
২০২৩ সালে যখন তার মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক নিয়মিত আনার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। মায়ের শরীরে পুষ্টির জোগান দিতেই নিজের বাসার ছাদে কটি আনারের চারা রোপণ করেছিলেন আল-আমিন। আজ মা তাকে ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেও, মায়ের স্মৃতির হাত ধরে আল-আমিন এখন একজন সফল উদ্যোক্তা।
আল আমিন উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে।
জানা যায়, ২০২৩ সাল আল আমিনের কাছে সময়টা ছিল জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ। আল আমিনের মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন নিয়মিত ‘আনার’ বা ডালিম খাওয়ানোর জন্য। বাজারের ফলগুলোতে কেমিক্যাল থাকে। ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের জন্য নিরাপদ ফলের অভাব থেকেই আল আমিন সিদ্ধান্ত নেন আনার চাষের। প্রথমে বাড়ির উঠানের কোণে ছোট কয়েকটি চারা রোপণ করেন, পরে বাসার ছাদে ড্রামে। ২০২৫ সালের মে মাসে আল আমিনের মায়ের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে আনার বাগানের পরিধি আরও বেড়েছে। তার নিজ হাতের কলম করা চারা সারা দেশে মানুষের ছাদ বাগানে চলে যাচ্ছে। প্রতি মাসে শুধু চারা বিক্রি করে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা।

তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিন বলেন, ২০২৩ সালে মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ওই সময় আমি গার্মেন্টসে চাকরি করতাম। মাকে চিকিৎসক আনার ফল খাওয়ানোর কথা বলেন। বাজারের আনারে কেমিক্যাল থাকে। ওই সময় বাজারে আনার ফল ক্রয় করতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগতো। এই টাকা দিয়ে আনার ক্রয় করা আমার জন্য কষ্টকর ছিল। মাকে ভালো ফল খাওয়ানোর জন্য বাড়ির উঠানে চারা রোপণ করি। প্রথমে ছাদে আনার বাগান করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। পরে ইউটিউবে ছাদে আনার বাগান করার ভিডিও দেখি। এরপর টঙ্গী থেকে কয়েকটি ছোট চারা ক্রয় করে আমার নিজের ছাদে ড্রামের মধ্যে রোপণ করি। সেই চারা থেকে বাগান গড়ে ওঠে। যখন দেখি, মায়ের শরীর বেশি ভালো না, তখন চাকরি বাদ দিয়ে দিই। এর এক সপ্তাহ পর আমার মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের জন্যই আনার বাগান গড়ে তুলে ছিলাম। মা ছিলেন আমার জন্য অনুপ্রেরণা। ২০২৫ সালে মে মাসে আমার মায়ের মৃত্যু হয়।
তিনি বলেন, বাগানে এখন প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার আনার চারা রয়েছে। আনার গাছ যারা ক্রয় করেন তাদেরকে আমি পরামর্শ দিই। আমার ছাদে ড্রামে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বড় আনার গাছ রয়েছে। এ ছাড়া এখন আমি ছাদে আঙুর, কমলা ও মালটা করছি। আমি নিজে গাছগুলো কলম করি ও চারা উৎপাদন করে বিক্রি করছি। দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আমার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছেন।

তিনি আরও বলেন, আমার কাছে ভারতের মহারাষ্ট্রের সুপার ভাগোয়া, মৃদুলা, গুজরাটি আনার, থাইল্যান্ডের থাই আনার, অস্ট্রেলিয়ার আনার, পাকিস্তানী আনারসহ ২৬ জাত রয়েছে। প্রতিমাসে খরচ বাদে ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় করতে পারি। কোনো কোনো মাসে বেশি চারা ব্রিক্রি করতে পারি।
আমার বাগানে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০ হাজার টাকা মূল্যের চারা রয়েছে। আমি নিজেই আমার কাজ করি। যখন দরকার হয় তখন শ্রমিক নিয়ে কাজ করি। মায়ের জন্য আনার গাছ লাগিয়ে ছিলাম। মায়ের জন্যই আমার ভাগ্য বদল হয়েছে। আমাকে দেখে অনেক তরুণ এগিয়ে আসছে। ছাদে আনার বাগান করার জন্য উৎসাহ পাচ্ছে।
স্থানীয় মিজানুর রহমান বলেন, আল আমিন ছাদে আনার বাগান করে সফল হয়েছে। সে আনারে কলম করে চারা বিক্রি করছে। তার মা যখন অসুস্থ তখন থেকেই বাসার ছাদে আনার বাগান করেন। তখন অল্প পরিসরে করলেও এখন বাগানের পরিধি বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন। তার কাছে থেকে চারা নিয়ে বাগান করছে। আমারও ইচ্ছে আছে তার মতো ছাদে আকারের বাগান করার।

আল আমিনের বাগান দেখতে আসা হাবিবুল্লাহ শেফুল বলেন, বাসার ছাদে চমৎকার একটি ছাদ বাগান দেখলাম। দেশের মাটিতে ও বাসার ছাদে এতো সুন্দর আনার চাষ হতে পারে আমার জানা ছিল না। আমি খুব দ্রুত তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিনের সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে আমার বাসার ছাদে আনার বাগান করব।
বাসাইল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু ইলিয়াস তালুকদার বলেন, আমাদের উপজেলার সফল তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিন। তিনি তার বাসার ছাদে আনার বাগান করেছেন। তার বাগানের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। প্রতি মাসে ভালো আয় করছেন। আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তাকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তার বাগান দেখে অনেক তরুণ ছাদে আনার বাগান করতে উৎসাহী হচ্ছে।
আরিফুল ইসলাম/এএমকে
