বিজ্ঞাপন

‘আমার ছেলে আর মা বলে ডাকবে না’—রাষ্ট্রীয় পদক বুকে মায়ের আহাজারি

‘আমার ছেলে আর মা বলে ডাকবে না’—রাষ্ট্রীয় পদক বুকে মায়ের আহাজারি

রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভর অকাল মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ। ছেলের অর্জিত রাষ্ট্রীয় পদক বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন তার মা। পরিবারের সদস্যরা সাদিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

নিহত সাদিক হোসেন শুভ (২৬) রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামের আশরাফ আলী শেখের ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। কর্মজীবনে তিনি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং সেরা ডুবুরি হিসেবে রাষ্ট্রীয় পদক লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ ফুটবলার ছিলেন। গোলরক্ষক হিসেবে গোয়ালন্দে তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল।

শোকাহত মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনদিন আগে ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। আগামী সপ্তাহে বাড়ি আসবে বলেছিল। বৃহস্পতিবার ওর বাবার কাছে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিল। আমার সোনার ছেলে আর কোনো দিন মা বলে ডাকবে না। আমি আমার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চাই।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীর ফায়ার ঘাটে পন্টুনের সামনে কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ করার সময় স্পিডবোট থেকে নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন সাদিক। প্রায় ৮ ঘণ্টা তল্লাশির পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমির চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাদিক অত্যন্ত মেধাবী গোলরক্ষক ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যু গোয়ালন্দের ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি।

সাদিকের চাচা ও গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ফজলুল হক জানান, ঘটনাস্থলে সাদিকের সঙ্গে আরও তিনজন সদস্য ছিলেন। ঢেউয়ের কারণে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে পড়ে যান বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে একজন রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ও দক্ষ ডুবুরির এমন মৃত্যু কীভাবে ঘটল, তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, ঢাকা থেকে তার মরদেহ রাজবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হয়েছে। মরদেহ নিজ বাড়িতে আনা হবে এবং সন্ধ্যায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।

পরিবারের দাবি, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেল সূত্রে জানা গেছে,  নারায়ণগঞ্জ ফায়ার স্টেশন প্রাঙ্গণে বেলা ১১টায় সাদিকের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপা. ও মেইন.) লে. কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান, পিএসসি, ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক  মো. ছালেহ উদ্দিন, বিএফএম, বিএফএম (এস), উপপরিচালক (অপা. ও মেইন.) মো. মামুনুর রশিদসহ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ অংশগ্রহণ করেন।

জানাজা অনুষ্ঠানের আগে সাদিকের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পরিচালক। এ সময় অগ্নিসেনাদের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এরপর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে প্রয়াত ফায়ারফাইটারের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করে শোনানো হয়।

প্রয়াত ডুবুরির পিতা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তারা সাদিক-এর পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের কাছে মরহুমের জন্য ক্ষমা ও দোয়ার আবেদন জানান। 

জানাজা শেষে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সাদিকের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার কুমড়াকান্দির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। শিশুকালে বেড়ে ওঠা নিজ গ্রামের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ডুবুরি সাদিক।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এসএইচএ