বিজ্ঞাপন

পল্লী বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগে বিপন্ন গারো পাহাড়ের বন্যপ্রাণী

পল্লী বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগে বিপন্ন গারো পাহাড়ের বন্যপ্রাণী

আইনের তোয়াক্কা না করে শেরপুরের গারো পাহাড়ে দেদারসে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি অসাধু চক্র এসব সংযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব বিদ্যুতের লাইনে পড়ে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক শকে ২০টিরও বেশি হাতি মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। তবে বন বিভাগ চাইলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের শেরপুর বন বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় মোট ১৯ হাজার ২৭৫ একর বনভূমির মধ্যে ২ হাজার ৩৭ একর বনভূমি বর্তমানে বেদখলে রয়েছে।

সরেজমিনে গারো পাহাড় ঘুরে দেখা যায়, একসময় পাহাড়জুড়ে ছিল উঁচু-নিচু টিলা আর ঘন বন। সেখানে বিচরণ করত নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। কিন্তু নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বনভূমিতে দখলদারদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ায় এখন সেই বন ঝলমলে আলোয় উপশহরে রূপ নিয়েছে। বন্যপ্রাণীগুলো তাদের আবাস হারিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরণ দুধনই গ্রামের বাসিন্দা মিতারু মারাক বলেন, ছোটবেলায় পাহাড়ে বাঘডাশ, বানর, হরিণ, বন্য শূকর, কাঠবিড়ালি, বনমোরগ, বিভিন্ন ধরনের সাপ ও অসংখ্য পাখি দেখতাম। এখন পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেছে। একের পর এক ঘরবাড়ি উঠেছে, বিদ্যুতের আলোয় সব আলোকিত। গহীন বন বলতে এখন কিছুই নেই, তাই বন্যপ্রাণীগুলোও চলে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১২ জন স্থানীয় জানান, বন বিভাগের জমিতে দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও অতিরিক্ত টাকা দিলেই সহজেই সংযোগ পাওয়া যায়। পল্লী বিদ্যুতের একটি অসাধু চক্র রয়েছে, যারা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংযোগ দিয়ে দেয়। মাত্র ৪-৫ হাজার টাকায় এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে বনভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপন বাড়ছে এবং বন হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনের ভেতরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ফলে প্রাণীরা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে একাধিক হাতি বিদ্যুৎ শকে মারা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে এবং দায়ীদের কারাভোগ করতে হয়েছে।

সেভ দ্য ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড ন্যাচার (সোয়ান) শেরপুরের যুগ্ম-সদস্যসচিব সানজিদা জেরিন বলেন, বনের জমিতে বাড়িঘর করা অবৈধ। সেখানে কাগজপত্র যাচাই ছাড়াই কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলো? এর ফলে বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আদনান আযাদ বলেন, ২০-২৫ বছর আগেও গারো পাহাড় ছিল ‘ডিপ ফরেস্ট’। এখন বন দখল হয়ে যাওয়ায় প্রাণীরা টিকে থাকতে পারছে না। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রাণী হত্যা। বিশেষ করে হাতি হত্যার দায় বিদ্যুৎ বিভাগ এড়াতে পারে না।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, যেখানে হাতি মারা হয়েছে সেখানে গিয়ে দেখেছি—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ সংযোগই কারণ। এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।

বালিঝুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার মো. সুমন মিয়া বলেন, পল্লী বিদ্যুৎকে বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে নিষেধ করা হলেও তারা আমাদের না জানিয়ে গভীর বনে অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে। সম্প্রতি রাজাপাহাড় এলাকায় লাইন দেওয়ার সময় তাদের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই আমাদের নির্দেশনা মানছে না।

এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শেরপুরের জেনারেল ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, বন বিভাগ চাইলে আমরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করব। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাগজপত্র যাচাই ছাড়া সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে।

সম্প্রতি গারো পাহাড় পরিদর্শনে এসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, প্রথমে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে।

পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, দ্রুত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও দখলদার উচ্ছেদ করা না হলে গারো পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

মো. নাইমুর রহমান তালুকদার/এসএইচএ