জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যে গণভোটে ৭০ ভাগ জনগণ রায় দিয়েছে, সেই একই দিনের ভোটে আপনারা সরকার বলে এখন দাবি করছেন। ওই গণভোট না থাকলে এই সরকারও মানা হবে না। ওই গণভোট যদি ব্যর্থ হয়, এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ওই গণভোট মানতে জনগণ আপনাদের বাধ্য করবে ইনশাআল্লাহ।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে বরিশালের হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের দাবিতে বরিশালে বিভাগীয় এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
বিএনপিকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা ৯১ সালের পরে ক্ষমতায় এসে বোঝেন নাই কাকে কেয়ারটেকার সরকার বলে। শেষ পর্যন্ত বুঝেছেন ঠিকই। আমরা বলবো জাতির ক্ষতি করে বুঝবেন না, এখনই বুঝুন। আমরা রাজপথে এভাবে থাকতে চাই না। আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে চাই। কিন্তু আপনারা যেভাবে ধাক্কায়ে ধাক্কায়ে আমাদেরকে রাজপথের দিকে দিচ্ছেন, রাজপথ জ্বলে উঠলে সেই আগুনে অনেক কিছু পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, গণভোটে এদেশের ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ বলেছে। হ্যাঁ বলার মাধ্যমে তারা জানিয়ে দিয়েছে অতীতের পচা রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থা আমরা আর চাই না। আমরা পরিবর্তন চাই। নতুন শাসন ব্যবস্থা চাই, নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। আফসোস, সরকারি দল তারা বলেছিল অধিকাংশ জনগণ যদি গণভোটে হ্যাঁ- এর পক্ষে রায় দেয় তাহলে আমরা গণভোটের প্রত্যেকটি দাবি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবো। আমরাও বলেছি, তারাও বলেছেন গণভোটে হ্যাঁ বলুন, আমরাও বলেছি গণভোটে হ্যাঁ বলুন। কিন্তু হ্যাঁ যখন বিজয়ী হলো। যেভাবেই হোক মেকানিজম করে তারা যখন ক্ষমতায় চলে গেলেন, তখন হ্যাঁ-টা তারা ভুলে গেলেন। এখন তারা বলতেছেন- আমরা কখনো সংস্কারের কথা বলি নাই। না না বন্ধুরা আপনারা সত্য বলছেন না, আপনারা মিথ্যা বলছেন। কারণ আপনাদের ৩১ দফা সংস্কারের দাবির প্রথম দফাই হচ্ছে সংস্কার। এখন বলেন যে সংস্কার কী জিনিস বুঝি না। আসেন আমরা সংবিধান সংশোধন কমিটি করি।
জামায়াত আমির বলেন, আমাদের সংসদের ভেতরে আপনারা দেখবেন মাঝে মাঝে একজন অবৈতনিক শিক্ষক, তিনি আমাদেরকে সবক দেন। এইটা সংবিধান, ওইটা সংবিধান, এইটা ধারা, ওইটা ধারা। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই- সংবিধান এবং কার্যপ্রণালী বিধির কোথায় আছে সংসদে আপনি একটা সংবিধান সংশোধন কমিটি করতে পারবেন মেহেরবানি করে তা দেখিয়ে দেন। আমরা যখন তার প্রতিবাদ করেছি, এখন শুনলাম সংসদের ভেতরেই তারা আওয়াজ দিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করলেন। আমরা এটাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। এখন নাকি তারা এটার নাম পাল্টাইয়া নতুনভাবে তারা আকিকা করতেছেন নতুন নামে। তারা এখন বলতেছেন বিশেষ কমিটি। জনগণের সাথে আর কত ছলচাতুরি করবেন, আর কত ধোঁকাবাজি করবেন। পদে পদে মিথ্যা বলবেন, ধোঁকা দেবেন পরিণতির জন্য তৈরি থাকুন।
শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে ২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৯টি বছর এদেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, আয়নাঘরের সঙ্গী হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মামলা মাথায় নিয়ে জেলে গিয়েছে। সন্তান হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, এমনকি স্ত্রীও হারিয়েছে, কিন্তু মানুষ ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করে নাই। সেই ফ্যাসিবাদকে বাংলাদেশ থেকে তুড়ি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা হাজার চেষ্টা করলে ওই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না। আপনারা ডামি ফ্যাসিবাদ হতে পারবেন। আসল ফ্যাসিবাদকেই জনগণ পাত্তা দেয় নাই। ডামি ফ্যাসিবাদ আবার কিসের? ফ্যাসিবাদ যে পথে হেঁটেছে আপনারা সেই পথে হাঁটছেন। খাসলতের একটারও পরিবর্তন আনেন নাই।
তিনি বলেন, ১৩৩টা অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছিল। যেই অর্ডিন্যান্সগুলা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল তার সবগুলো বিএনপি রেখে দিয়েছে। এটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তারা বলে সুন্দর করে আমরা আরো ভালো করে এগুলা নিয়ে আসব। এ পর্যন্ত ছয় মাস চলে যাচ্ছে কই ভালো করে তো এটা আনতে পারলেন না। আমরা বুঝতে পারছি জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আরেকটা অপকৌশলের আশ্রয় তারা নিতে পারেন। তাদের মনমতো একতরফা ওই অবৈধ কমিটিতে আলাপ-আলোচনা করে। সংবিধান সংশোধন কমিটি বলে কোনো কমিটি নাই। এটা অবৈধ যদি গঠন করা হয়ে থাকে। ওখানে আলাপ-আলোচনা করে তাদের মনমতো কিছু জিনিস স্বৈরশাসনকে পোকাপোক্ত করার জন্য তারা হয়তো নিয়ে আসবে। দুই তৃতীয়াংশের জোরে হয়তো পাসও করবে। তারপরে বলবে আগে তো সংবিধানে গণভোট ছিল না। এখন পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে এটা ফিরে এসেছে। আমরা এখন এই বিষয়গুলোই গণভোটে দেবো। এ রকম কোনো ভাওতাবাজি যদি করা হয়, অগ্রিম বলে রাখছি- এই জাতি আপনাদেরকে ছেড়ে কথা বলবে না। সাবধান ধোঁকার পথে পা বাড়াবেন না।
শফিকুর রহমান বলেন, চব্বিশের একটা চমৎকার স্লোগান ছিল আমাদের সন্তানদের। লেগেছে রে লেগেছে। রক্তে আগুন লেগেছে। রক্তে আগুন ধরাবেন না। এই প্রজন্মের আর পরীক্ষা নেবেন না। এরা পরীক্ষিত। এরা বিজয়ী, এরা বীর।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাইকেও ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কত কসরত। এইটা ওইটা, ৭১ সাল- অবশ্যই এটি আমাদের গর্বের। এটি আমাদের ইতিহাসের সোনালী অংশ। ২৪ টানতে গিয়ে ৭১ টানতে হবে কেন। ৭১ থাকবে ৭১ এর মর্যাদায়, ২৪ থাকবে তার মর্যাদায়। এই ২৪ আমরা হারিয়ে যেতে দেব না ইনশাআল্লাহ। ২৪ এর বীরদেরকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করতে হবে সে শহীদ হোক আর গাজী হোক, ২৪ নিয়ে কোনো অবহেলায় জাতি বরদাসত করবে না।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন। এছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য দেন।
আরএআর
