বিজ্ঞাপন

বিলুপ্তির পথে ত্রিবেনীপুলের শতবর্ষী বাদ্যযন্ত্র শিল্প

বিলুপ্তির পথে ত্রিবেনীপুলের শতবর্ষী বাদ্যযন্ত্র শিল্প

নারায়ণগঞ্জের বন্দরের সোনাকান্দা এলাকার ত্রিবেনীপুল। ছোট্ট একটি জনপদ। তবে দেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বহু বছর ধরে পরিচিত এই এলাকা। বংশপরম্পরায় এখানকার কারিগরেরা তৈরি করে আসছেন তবলা-বায়া, ঢোল, খোল, নাল, পাখোয়াজ, ঢোলক, খঞ্জরি, খমকসহ অর্ধশতাধিক ধরনের বাদ্যযন্ত্র। দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সংগীতশিল্পী ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের কাছে এখানকার তৈরি যন্ত্রের আলাদা সুনাম রয়েছে।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সংগীতচর্চা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দক্ষ কারিগরের সংকট এবং উত্তরসূরিদের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ত্রিবেনীপুলের এই শতবর্ষী শিল্প।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় বাদ্যযন্ত্র তৈরির দোকান রয়েছে মাত্র চারটি। সেখানে প্রায় ২০ জন কারিগর কাজ করছেন। পাশাপাশি কয়েকটি পরিবার নিজেদের বাড়িতেও অর্ডার অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে থাকেন। তবে আগের মতো কর্মব্যস্ততা নেই। অনেক সময় দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও ক্রেতার দেখা মেলে না।

কারিগর ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিল্পীরা ত্রিবেনীপুলে এসে বাদ্যযন্ত্র অর্ডার দিতেন। ছায়ানট, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সায়েন্স ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে এখানকার তৈরি বাদ্যযন্ত্র সরবরাহ হতো। এমনকি বিদেশেও, বিশেষ করে ভারতের কলকাতায় এসব বাদ্যযন্ত্র যেত। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

১৯৯০ সাল থেকে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নির্মল মিউজিক সেন্টারের মালিক ও কারিগর দুলাল চন্দ্র দাস। নিজের হাতে বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার পাশাপাশি দোকানও পরিচালনা করেন তিনি।

দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, আগের মতো আর কাজ নেই। চামড়া পাওয়া কঠিন, ভালো কারিগর পাওয়া যায় না, সব কিছুর দাম বেড়েছে। মানুষ এখন গিটার, কিবোর্ড কিংবা ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। তবলা-বায়ার বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, পেটের দায়ে এখনো কাজ করে যাচ্ছি। বয়স হয়ে গেছে। আমার পর আর কেউ এই পেশায় আসবে না। আমার সন্তানদেরও এই কাজে আনতে চাই না।

ত্রিবেনীপুলের তবলা তরঙ্গের মালিক অরবিন্দু দাস বলেন, এখন কোনো লাভ নেই। কোনোমতে সংসার চলছে। আমি নিজে এই কাজ করছি, কিন্তু ছেলেদের এই পেশায় আনিনি। আমি যে কষ্ট করছি, তারা যেন সেই কষ্ট না করে।

শ্রী লোকনাথ যন্ত্র সঙ্গীতের মালিক স্বপন কুমার দাস বলেন, আমাদের বাবা-দাদারা এই পেশায় ছিলেন, আমরাও আছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন।

তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না। সম্মানও কমে গেছে। কয়েক বছর পর হয়তো এই শিল্প আর থাকবে না।

১৫-১৬ বছর ধরে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজ করছেন কারিগর প্রদীপ মনি দাস। তিনি বলেন, একসময় এই কাজ করে ভালোভাবে সংসার চলত। এখন ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচও চালানো কঠিন হয়ে গেছে।

আরেক কারিগর অজিত দাস বলেন, আগের তুলনায় মজুরি কমে গেছে। কাজও কম। দিন দিন এই পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

কারিগরদের মতে, নতুন কেউ এই কাজ শিখতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে অভিজ্ঞ কারিগররা একে একে পেশা ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে বাদ্যযন্ত্র তৈরির এই ঐতিহ্য বহন করার মতো মানুষ থাকবে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যাত্রা, পালাগান কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনে জীবন্ত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল বেশি। এখন অনেকেই ইন্টারনেট বা ডিজিটাল সাউন্ড ব্যবহার করছেন। বাজারে ইলেকট্রনিক তবলা ও অন্যান্য আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সহজলভ্য হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে গরু ও ছাগলের চামড়া, নিম ও মেহগনি কাঠ, পিতল, তামা, লোহার রিং ও বিভিন্ন ধরনের রশি প্রয়োজন হয়। এসব কাঁচামালের প্রায় সবগুলোর দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কারিগরদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চামড়া সংগ্রহ করতেই প্রতিটি পিসে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এছাড়া কাঠ, পিতল ও তামার ডাইস বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে বাদ্যযন্ত্রের বিক্রিমূল্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে এক জোড়া তবলা-বায়ার দাম সাধারণত ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। খঞ্জরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, নাল ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা, পাখোয়াজ প্রায় ১১ হাজার টাকা এবং উন্নত মানের চেঞ্জার তবলা-বায়ার দাম ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাসুদুল হাসান তাপস বলেন, ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারিগর বা উদ্যোক্তারা আবেদন করলে আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা করব।

বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার বলেন, ত্রিবেনীপুলের বাদ্যযন্ত্র শিল্প সম্পর্কে আমরা খোঁজ নেব। প্রয়োজন হলে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো সহায়তার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা হবে।

মেহেদী হাসান সৈকত/এসএইচএ