বিজ্ঞাপন

পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে বসতভিটা, বালুর নিচে চাপা পড়েছে কৃষকের স্বপ্ন

পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে বসতভিটা, বালুর নিচে চাপা পড়েছে কৃষকের স্বপ্ন

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামে সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। আকস্মিক ঢলের প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশ। ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা বালুতে ঢেকে গেছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর পাশাপাশি আগামী বোরো মৌসুমে ধান চাষ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয়দের দাবি, এবারের পাহাড়ি ঢলে প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ একর কৃষিজমি, ২৫ থেকে ৩০টি বসতঘর এবং কয়েকটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, চারাগাঁও-বাঁশতলা এলাকার পাহাড়ি ছড়া দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে থাকায় এবার ঢলের পানি স্বাভাবিক পথে না গিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে চারাগাঁও, বাঁশতলা, মাইঝহাটি, জঙ্গলবাড়ি, লাকমা, লালঘাট, চানপুর ও কলাগাঁও গ্রামে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চারাগাঁও গ্রামের ছড়ার পাড়ের অনেক ঘরবাড়ি স্রোতের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের মেঝে ধসে গেছে, কোথাও পুরো ঘর ভেঙে পড়েছে। অনেক পরিবার বসতভিটা ছেড়ে এখন স্বজনদের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

চারাগাঁও গ্রামের এমনই একজন হৃদয় মিয়া। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে বাঁশ ও টিন দিয়ে ছোট্ট একটি ঘর তুলেছিলেন তিনি। পাহাড়ি ঢলে সেই ঘর এখন বসবাসের অযোগ্য। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় এক ব্যাবসায়ীর ডিপোতে (কয়লা সংরক্ষণের স্থান) আশ্রয়ে থাকা এই দিনমজুর বলেন, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। দিনমজুরের কাজ করি, কিভাবে কি করবো আল্লাহ জানেন। সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পেলে অন্তত মাথা গোঁজার ঘরটা আবার তুলতে পারব।

একই গ্রামের আছিয়া বেগমের অবস্থাও প্রায় একই। ঢলের পানিতে ঘরের আসবাবপত্র, রান্নার সামগ্রী ও জমানো ১৫ হাজার টাকাও ভেসে গেছে।অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

আছিয়া বেগম আক্ষেপ করে বলেন, এতো বড় ক্ষতি হইলেও কেউ আমাদের খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। ঘরের মাঝে বড় বড় গর্ত। তাই অন্যের বাড়িতে থাকা লাগছে।

শুধু ঘরবাড়িই নয়, বড় সংকটে পড়েছেন কৃষকরাও। বাঁশতলা গ্রামের কৃষক মো. নজম উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালুতে তার চার বিঘা জমি চাপা পড়েছে। দ্রুত বালু সড়ানো না গেলে আগামী বোরো মৌসুমে চাষাবাদ করা যাবে না। 

একই গ্রামের আরেক কৃষক মো. আব্দুল ছাত্তার বলেন, ঢলে প্রতিবছর যে বালু নিয়ে আসে তা তা আমরা নিজেরাই সরিয়ে নেই। পরের বর্ষায় ঘুরেফিরে সেই একই সমস্যা আমাদের। আমাদের এই সমস্য  থেকে মুক্তির ব্যাপারে সরকার নজর দিক।

চারাগাঁওয়ের ব্যবসায়ী হালিম বলেন, পাহাড়ি ঢলে হাওরবাংলা টেকনিকেল স্কুলের সীমানা প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লাকমার পূর্ব পাশের সড়কের বিভিন্নস্থানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলেও দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং উজানে আকস্মিক ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্রতাও আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক ছড়া ও পানি চলাচলের পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঢলের পানি নতুন পথে প্রবাহিত হয়ে জনপদ ও কৃষিজমিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, আমরা অনেকেই আবহাওয়ার খবর রাখি না। এ ব্যাপারে আমাদেরর আরো সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে আগাম পাহাড়ি ঢলের তথ্য দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সীমান্তবর্তী ছড়া পুনঃখনন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি থেকে বালু অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ভোগ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হায়দার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে থাকা পাহাড়ি ছড়াই এবারের ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ। পানি প্রবাহিত হওয়ায় পথ না পেয়ে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা এবং কৃষিজমিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। দ্রুত এই ছড়াগুলো খনন করা দরকার। এমনটা না করলে প্রতি বছর এমন ক্ষতি হবে।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে এখনও আসলে পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে জরিপ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির সঠিক তথ্য বলা যাবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, এখন সরকারের দেওয়া কৃষি কার্ড প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন উপ সহকারী কর্মকর্তাগণ। চলমান এই দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে কর্মকর্তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন ।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তামিম রায়হান/আরকে

বিজ্ঞাপন