সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি জেলার মৎস্যখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার ৯টি উপজেলায় ৩৪৫ জন মাছচাষির ৪০৫টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মোট প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। জেলা মৎস্য বিভাগের প্রস্তুত করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দীঘিনালা ও মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। দীঘিনালায় ৫৭টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৯৪ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। মাটিরাঙ্গায় ৯৫টি পুকুরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এছাড়া খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় ৬৫টি পুকুরে প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, গুইমারায় ৩টি পুকুরে ৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, মহালছড়িতে ৭২টি পুকুরে প্রায় ২৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, পানছড়িতে ৮টি পুকুরে প্রায় ২৭ লাখ ১৪ হাজার টাকা, লক্ষ্মীছড়িতে ২৮টি পুকুরে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, মানিকছড়িতে ৩৭টি পুকুরে প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং রামগড়ে ৪০টি পুকুরে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও ঘেরগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৮৬ হেক্টর। বন্যার তীব্র স্রোতে অধিকাংশ পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মাছচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তালিকা সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খাগড়াছড়ি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. রাজু আহমেদ বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সরকারের বরাদ্দ সাপেক্ষে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা পরবর্তী সময়ে অনেক পুকুরে মাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যার কারণে পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে গেছে। যেসব পুকুরে বন্যার পানি ঢুকে মাছ ভেসে গেছে, সেসব পুকুরে ফিটকিরি, চুন এবং জীবাণুনাশক হিসেবে পটাশিয়াম প্রয়োগ করে পুকুর শোধনের পর পুনরায় মাছ চাষ শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে শুধু মৎস্যখাত নয়, জেলার সড়ক যোগাযোগ, অবকাঠামো ও কৃষিখাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক, এলজিইডির প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক এবং গ্রামীণ প্রায় ৯৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার হেক্টরের বেশি ফসলি জমি পানিতে তলিয়েছে। তার মধ্যে ২৩৩ হেক্টর কৃষিজমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। গৃহপালিত পশু-পাখির ক্ষয়ক্ষতিও যাচাই করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদেরও সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে প্রতারক চক্রের তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, দুর্যোগের সময় বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার চেষ্টা দেখা যায়। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং কোনো ধরনের গুজব বা প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মোহাম্মদ শাহজাহান/আরকে
