বিজ্ঞাপন

গণঅভ্যুত্থানে ভোলার ১৩ শহীদের পরিবার কেমন আছে এখন?

গণঅভ্যুত্থানে ভোলার ১৩ শহীদের পরিবার কেমন আছে এখন?

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আজকের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে নিহত হন ভোলার ১৩ যুবক। এর মধ্যে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং পদদলিত হয়ে একজন নিহত হন। তারা ছিলেন কলেজ-মাদরাসাছাত্র, দিনমজুর, রিকশা, ভ্যানচালক ও হোটেল কর্মচারী।

সংসারের অভাব দূর করতে উন্নত জীবনের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমিয়ে প্রাণ হারিয়ে একে একে তারা ১৩ জন ঘরে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ আন্দোলনে একদিনে এতো প্রাণ ঝড়েনি অন্য কোনো জেলার মানুষের। 

ভোলার সাবেক জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বর্তমান সিভিল সার্জন, ইউএনও, ভোলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, সাবেক সমন্বয়ক রাহিম ইসলাম এবং হিমুর ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের স্বাক্ষরিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভোলার শহীদদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিহত ১৩ জনের মধ্যে রয়েছেন- ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের আবুল কাশেমের ছেলে ড্রাইভার বাবুল (৪০), বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড় মানিকা ইউনিয়নের জলিল মাতুব্বরের ছেলে ও ভোলা সরকারি কলেজের ছাত্র নাহিদ (২১), দেউলা ইউনিয়নের লালু মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রী ইয়াছিন (২৩) এবং পদদলিত হয়ে নিহত হন একই ইউনিয়নের আবু ইমাদ্দির ছেলে রিকশাচালক জামাল উদ্দিন (৩৫)। 

এছাড়া লালমোহন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের মো. ইউসুফের ছেলে হোটেল কর্মচারী আরিফ (১৭), পাঙ্গাসিয়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে লন্ড্রি দোকানি মোছলেহ উদ্দিন (৩৫), কালমা ইউনিয়নের বজলুর রহমানের ছেলে রিকশাচালক আক্তার হোসেন (৩৫), লেজছকিনা গ্রামের খলিল রদ্দির ছেলে মুফতি শিহাবউদ্দিন (৩০), বদরপুর ইউনিয়নের জলিল উদ্দিনের ছেলে মিষ্টি দোকানের কর্মচারী শাকিল (২০), একই উপজেলার আকবর হোসেনের ছেলে হোটেল কর্মচারী সাইদুল (১৪)।

এবং চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষন থানার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের সালাউদ্দিন ফরাজির ছেলে বেকারির সেলসম্যান মো. সোহাগ (১৭), একই থানার রসুলপুর ইউনিয়নের আবু জাহেরের ছেলে রাজমিস্ত্রী বাহাদুর হোসেন মনির (১৮) এবং দুলারহাট থানার চর নুরুল আমিন গ্রামের মো. জাফরের ছেলে ট্রাকচালক মো. হোসেন (২৫)। 

আজ তাদের সবার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। স্বজনদের গগনবিদারি বিলাপ আজও থামেনি। ১৯ জুলাই তাদের কাছে এক বিভীষিকাময় তারিখ। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে, যার প্রত্যেকটির প্রধান আসামি দেশের সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর পুর্ণ হতে চললেও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ স্বজনদের।

কেমন আছে শহীদদের পরিবারগুলো?

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইউসুফ ও ফরিদা বেগম দম্পতির ৬ ছেলে মেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলে ছিল মো.আরিফ (১৭)। দরিদ্র কৃষক বাবার উপার্জনে স্থানীয় একটি মাদরাসায় আলিম বিভাগে পড়াশোনা করতেন, জুলাইয়ের প্রথম দিকে মাদরাসা বন্ধ থাকায় কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকায় পাড়ি জমান আরিফ।

শহীদ আরিফের বাবা ইউসুফ কান্নাজড়িত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, কেন আমার নিরীহ ছোট্ট পোলাডারে গুল্লি কইরা মারলো? আমার বংশের বাতি জ্বালানোর মতো তো কেউই রইলো না। পোলাডা অনেক নম্রভদ্র ছিল,মাদরাসায় পড়তো। 

তিনি বলেন, মাদরাসা বন্ধ থাকায় আরিফকে তার মামাতো ভাই তার দোকানে কাজ করার জন্য ঢাকায় নিয়েছিল,সেখানেই কাজ করতো। কিন্তু ১৯ জুলাই যখন আরিফ রাস্তায় গেল তখন গুল্লিতে পোলাডার মাথা ফুডা হইয়া গেছে। লাশ বাড়িতে আনার সময়ও প্রতি পরতে পরতে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এহন আমি বুড়া হইয়া গেছি, অনেক আশা ছিল পোলাডারে লইয়া,পোলাডা বাইচা থাকলে আমার আর কোনো চিন্তা থাকতো না। কাজকাম করার শক্তি নাই শরীলে। সরকার মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা দেয়। যা দিয়ে মেয়েদের পড়াশোনা আর সংসার চালানো যায় না। আমি কিছুই চাই না, পোলা হত্যার বিচার চাই। ১৯ জুলাই আমার আদরের পোলার মৃত্যুবার্ষিকী, তাই গত শুক্রবার বাড়ির সামনের মসজিদে মিলাদ পড়াইছি। 

বোরহানউদ্দিনের বড় মানিকা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং ভোলা সরকারি কলেজের সাবেক ছাত্র শহীদ নাহিদের (২১) বাবা জলিল মাতুব্বর ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার একমাত্র পোলাডারে তো চিরদিনের জন্যেই হারাইলাম, আর তো ফিরে আইবো না। পোলার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিন আগেই গত শুক্রবার বাড়িতে মিলাদ পড়িয়েছি। সারাক্ষণ পোলাডার কথা মনে পড়ে। 

এছাড়া অন্যান্য শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় তাদের স্বজনরা ইতোমধ্যে দোয়া ও মিলাদ পড়িয়েছেন, আবার অনেকেরই আজ মৃত্যুবার্ষিকীর দিন অর্থাৎ আজ রোববার (১৯ জুলাই) যে যার সুবিধামতো সময়ে মিলাদ পড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে না উঠার অভিযোগ

শহীদদের সেই কাঙিক্ষত  বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে উঠেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ সিয়ামের ভাই ও ভোলার শহীদ পরিবার প্রতিনিধি রাসেল হোসেন রাফি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভোলার জুলাই শহীদ পরিবারগুলো খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারিভাবে এসব পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয় যা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। প্রতি পরিবারে যে যে শহীদ হয়েছেন তারা বেঁচে থাকলে পরিবারগুলো আরও ভালোভাবে চলতে পারতো। প্রত্যকের বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তান রয়েছে। সরকার যদি আরও উদ্যোগ নিতো তাহলে শহীদ পরিবারগুলো ভালোভাবে দিন কাটাতে পারতো। 

রাসেল আরও বলেন, শহীদরা তাদের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে যে বৈষম্যহীন কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল তা হয়নি। সেই বৈষম্য রয়েই গেল। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, বিচার পাচ্ছি না। আমরা আসলে এমন বৈষম্যের বাংলাদেশ চাইনি। সরকারের কাছে আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা হলো- বিচার চাই।  

১৯ জুলাই যা ঘটেছিল ঢাকার রাজপথে

‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ সংগঠনের ভোলা জেলার সদস্য সচিব মো. রাকিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইতেও আমরা ঢাকার রাজপথে ছিলাম। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল দলে দলে, সাধারণ মানুষ ও ঘরে বসে থাকেননি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অবিস্মরণীয় দিন। এদিনে ঢাকার রাজপথে শহীদ হন শুধু ভোলারই ১৩ জন। রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গার আন্দোলন ভয়াবহ রুপ নিয়েছিল। আন্দোলন দমাতে পুলিশ ও র‍্যাবের সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ভোলার মানুষও আন্দোলনে ছিল, পিছপা হয়নি। গুলির সামনে আমরা আবু সাঈদের মতো বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলাম, গুলিতে অনেকেই হয়েছেন শহীদ, আবার অনেকেই আহত।

খাইরুল ইসলাম/আরকে