‘সরকার কি জুলাই গণহত্যার বিচার করবে? ছেলেকে হারানোর দুই বছর হলো, এখনও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। আমরা কার কাছে বিচার চাইব? আগের সরকার (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) শুধু আশ্বাস দিয়ে গেছে। আমার মতো মা সন্তান হারিয়েছে, কত স্ত্রী তার স্বামী হারিয়েছে, কত সন্তান তার বাবা হারিয়েছে, এই হারানোর দুঃখ, কষ্ট, বেদনা কি সরকার বুঝতে পারছে না? ছেলে হত্যার বিচার দেখার আশায় আছি। যদি বিচার না পাই আল্লাহ কাউকে ক্ষমা করবে না।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ মেরাজুল ইসলাম মেরাজের বৃদ্ধ মা আম্বিয়া বেগম। তার মতো চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সন্তান হারানোর এক বুক যন্ত্রণা আর হাহাকার নিয়ে বিচারের অপেক্ষায় আছেন শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম ও শহীদ মানিক মিয়ার মা নুরজাহান বেগম এবং শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আব্দুর রহমান।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ নিহত হন সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন (২৯), স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন (৩৫), ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম মেরাজ (৩৭) আর শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির (২৮)। সেইদিন তাদের কারো হাতে অস্ত্র হাতে ছিল না। বৈষম্য, শোষণ, দমন-নিপীড়নসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠে ছিল স্লোগান, মনে ছিল অসীম সাহস আর কিছু প্রশ্ন। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে শ্রাবণের সেই পড়ন্ত বিকেলে নিভে যায় একে একে চার ৪টি তাজাপ্রাণ।
ক্যালেন্ডারের পাতায় চব্বিশ পেরিয়ে ফের জুলাই ফিরেছে। দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছে ৭৩০ দিন। কিন্তু সাজ্জাদ, মেরাজ, মিলন কিংবা তাহির_কেউই আর ফিরে আসেনি। অথচ তাদের রক্তের ললাট জমাট বেঁধে শ্রাবণের মেঘ হয়ে ফের ফিরে এসেছে। আজ সেই রক্তাক্ত ১৯ জুলাইয়ের দুই বছরপূর্তি। প্রিয়জন হারানো শহীদ পরিবারের প্রত্যেকের হৃদয় এখনো তীব্র বেদনায় কাতর। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে কেউ হয়ে পড়েছেন দিশাহারা।
শহীদের মা হিসেবে আর কেউ ডাকে না
২০ বছর আগে স্বামী শামছুল হককে হারিয়েছেন বিধবা আম্বিয়া বেগম। তিনি নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্বামীহারা সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়েই অভাব অনটনে কেটেছে তার একেকটি দিন। ছেলে মেরাজ যখন স্বাবলম্বী হয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। ঠিক তখনই একটি গুলিতে থমকে গেছে পুরো পরিবারের স্বপ্ন।
এখন ছেলে নেই, নেই ছেলের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানরা। আম্বিয়া বেগমের ভাষায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাদের মা-ছেলের সম্পর্কে ব্যবচ্ছেদ তৈরি করেছে। শুধু ছেলেকে কেড়েই নেয়নি, তাকে আলাদা করে দিয়েছে ছেলের বউ আর নাতিদের কাছ থেকেও। এরপর নেপথ্যে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অনুদান, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সম্মান আর আমন্ত্রণে ডাক পাওয়া না পাওয়ার অভিযোগ।

শহীদ মেরাজুল ইসলামের মা আম্বিয়া বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলে শহীদ হবার পর থেকে অনেকেই বাসায় আসতেন। খোঁজখবরও নিতেন। তখন ছেলের বউও বাসায় ছিলো। এখন ছেলের বউ ও দুই নাতি আলাদা থাকে। ওরা আমার খোঁজ করে না। আগের মতো কেউ আর শহীদ মেরাজের হিসেবে কোথাও ডেকেও নেয় না। আমার ছেলের বউ তার স্বামী হারিয়েছে, নাতিরা তাদের বাবা হারিয়েছে আর আমি কোলেপিঠে লালন করা সন্তানকে হারিয়েছি। আমার অন্য সন্তানরা তাদের ভাইকে হারিয়েছে। একেকজনের দুঃখ-কষ্ট একেক রকম। কিন্তু সবার চাওয়া এই হত্যার যেন বিচার হয়। আমি কারো কাছে কিছু চাই না, শুধু ছেলে হত্যার বিচারটা দেখে মরতে চাই।
শহীদ মেরাজের বড় বোন রাবেয়া বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার ছোট ভাই মারা যাওয়ার পর এলাকার এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আমার মা হত্যা মামলা করেছিলেন। এরপর আমাদেরকে না জানিয়ে আমার ভাইয়ের বউও বাদী হয়ে আলাদা আরেকটি মামলা করেন। দু’টি মামলার তদন্তভার সিআইডিতে। এখন পর্যন্ত কোনো আশার আলো দেখছি না আমরা। উল্টো বিভিন্ন ফোন নম্বর থেকে, কেউ কেউ বাড়িতে এসে আমার মাকে মামলা প্রত্যাহার করার জন্য নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। কেউ কেউ অর্থের প্রলোভনও দেখাচ্ছে। কিন্তু আমরা তো কারো কাছে টাকা পয়সা চাইছি না। আমরা শুধু আমার ভাইয়ের হত্যার সাথে জড়িতদের বিচার চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থাটা করেন।
সেদিন ছিল মেরাজের বিবাহবার্ষিকী
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ১৮তম বিবাহবার্ষিকীর দিনে স্বামী হারা হন নাজমিন ইসলাম। দুই ছেলে সন্তানকে নিয়ে একই এলাকায় আলাদা বসবাস করছেন শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন।
স্বামীর স্মৃতি নিয়ে জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যখন আন্দোলন চলছিল, তখন আমার জীবনে যে এমন দিন মেনে আসবে কখনো কল্পনাও করিনি। সেদিন আমার বিবাহবার্ষিকী ছিল। উনি (মেরাজ) আমার জন্য নতুন থ্রি-পিস কিনে এনেছিলেন। কিন্তু আমি সেই থ্রি-পিস পরে তাকে সামনে দাঁড়াতে পারিনি। নতুন কাপড়ে রাতে একসঙ্গে ঘুরতে বেড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু সেদিন সিটি বাজারের সামনে পুলিশের গুলিতে আমার স্বামী মারা যান।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেরা তাদের বাবা হারিয়েছে, আমি স্বামী হারিয়েছি। এখন এই সংসারে দুটি সন্তান নিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে আমাকে লড়াই করতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়া ও নিয়মিত খরচাপাতি সবই তো আমার ঘাড়ে। সরকারিভাবে যে ভাতা পাচ্ছি, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। অনেক আশা নিয়ে আছি স্বামী হত্যার বিচার পাবো। কিন্তু মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। মাঝে মধ্যে কিছু কিছু কারণে মনে হয়, এই সরকার গণহত্যার বিচার করবে না।
সবজি কিনতে বেরিয়ে লাশ হয়ে ফেরেন সাজ্জাদ
ঘটনার দিন ১৯ জুলাই শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ আদায় করেন সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন। সেদিন বাড়িতে স্ত্রী জিতু বেগম না থাকায় হোটেলে ভাত খান। সাজ্জাদের পরিকল্পনা ছিল পরের দিনের জন্য আদা, রসুন, পেঁয়াজ কিনে বাসায় রেখে সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ি যাবেন। শ্বশুরবাড়িতে তার স্ত্রী-সন্তান কয়েক দিন আগে বেড়াতে গেছেন। তাদের নিয়ে বিয়ের দাওয়াত খেতে যাবেন সাজ্জাদ। কিন্তু এক গুলিতে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দাওয়াতে যাওয়া হয়নি সাজ্জাদের। লাশ হয়ে ফিরেছেন বাড়িতে।

নিহত সাজ্জাদের মা ময়না বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেদিন সকাল থেকে কোথাও কোনো মারামারি হয়নি। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে ছেলে সিটি বাজারে গেল সবজি কিনতে। কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়িতে লোকজন সবজির ব্যাগের বদলে আমার ছেলের লাশ নিয়ে আসে। সেই দিনটার কথা আজো ভুলতে পারিনি। ছেলে নেই, এখন শুধু দোয়া করি আল্লাহ্ যেন আমার ছেলেকে কবরে ভালো রাখেন।
এ সময় সাজ্জাদের মা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, সরকার আমার সাজ্জাদ হত্যার বিচারটা করলে মরেও শান্তি পাব। আমার নাতনি আর ছেলের বউয়ের জন্য সরকার কিছু করে দেয়। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব চিন্তিত, কী করব কী হবে? সরকার যেন এসব শহীদ পরিবারের কথা ভুলে না যায়।
উপার্জনক্ষম সাজ্জাদকে হারিয়ে অসহায় পরিবার
রংপুর নগরীর শিক্ষাঙ্গন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন কামাল কাছনা রোডে বাড়ি সাজ্জাদের। তার বাবা ইউসুফ আলী ছয় বছর আগে মারা গেছেন। সাজ্জাদ হোসেন ভ্যানে করে নগরীর আরসিসিআই স্কুল অ্যান্ড কলেজ মোড়ে আদা, রসুন, পেঁয়াজসহ শাক-সবজি বিক্রি করতেন। পাশাপাশি তিনি রাজমিস্ত্রির কাজও করতেন। কারণ সাজ্জাদই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
সাজ্জাদের দুলাভাই আলী হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের গেট দিয়ে সিটি বাজারে যাওয়ার পথে সাজ্জাদ আকস্মিক পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের মধ্যে আটকা পড়েন। অবস্থা বেগতিক দেখে একপর্যায়ে লুকাতে গিয়ে একটি গুলি এসে তার পেটের বাম পাশে লাগে। গুলিটি পেটের বাম পাশে ঢুকে ডান পাশ দিয়ে হাতের কনুই হয়ে বের হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, স্ত্রী-সন্তান, মা ও এক ভাগনিকে নিয়ে সাজানো ছিল সাজ্জাদের ছোট্ট সংসার। ছোট ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকেন। বোনদের সবার বিয়ে হয়েছে। সাজ্জাদ কখনও রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন আবার কখনো ভ্যানে করে শাক-সবজি বিক্রি করতেন। আজ সাজ্জাদ বেঁচে না থাকায় পরিবারটি খুবই অসহায় জীবনযাপন করছেন বলেও তিনি জানান।
যৌথবাহিনীর ভয়ে পালিয়ে ছিলেন মিলনের পরিবার
দুই বছর আগে ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন মিলনের দাফনের পর তার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল যৌথ বাহিনী। ৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিবারের সবাই ছিলেন পলাতক। এ কথা জানিয়েছেন তার স্ত্রী দিলরুবা আক্তার। শুধু তাই নয় হাসপাতালে লাশও গুম করার চেস্টা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। দিলরুবা আক্তার রংপুর নগরীর বৌরানী জুয়েলার্সের ম্যানেজার গুড়াতিপাড়ার বাসিন্দা শহীদ মুসলিম উদ্দিন মিলনের স্ত্রী।
ঢাকা পোস্টকে তার স্বামী নিহত হবার ঘটনার বিষয়ে দিলরুবা বলেন, আমার স্বামী নামাজ শেষে আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। মারা যায় বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে। আসরের নামাজও মসজিদে পড়েছিল। আমার স্বামী আন্দোলনের সামনে ছিল। একটা গুলি লাগে বুক বরাবর। ওখানেই মারা যায়। এরপর ছেলে কোনো রকমে মেডিকেলে নিয়ে যায়। মেডিকেল থেকে লাশ নেয়ার পর হাসপাতালের কর্মকর্তারা আমাদের খুব হেনস্তা করেছে।
দিলরুবা আক্তার বলেন, আমার স্বামী আমাদের মাথার উপরে ছাদ হয়ে ছিলেন। শুধু ভাতা আর অনুদান দিলে হবে। আমাদেরকে বিভিন্ন শান্তনা দিয়েও বিচার আটকে রাখা ঠিক হবে না। সরকারের স্বদিচ্ছার অভাবে বিচার কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। আমরা ভীষণ চিন্তিত। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।
একই অভিযোগ নগরীর জুম্মাপাড়ার শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আব্দুর রহমানের। তিনি ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে বলেন, আমার ছেলে তো দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ এবং বৈষম্যদূরীকরণের মধ্যদিয়ে স্বচ্ছতা ও সমতার নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তাহির। সেই তাড়না থেকেই সে আন্দোলনে গিয়েছিল। এখন তার আত্মা শান্তি পাবে যদি দেশে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়। গণহত্যার বিচার হয়।
হত্যা মামলা, তদন্তভার ও সবশেষ অগ্রগতি
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান ৪ জন। গুলিতে আহত হন শতাধিক মানুষ। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এসব নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারিগর ও হুকুমদাতা প্রভাবশালী আসামিদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এমনকি শেষ হয়নি কোনো মামলার তদন্ত, দেওয়া হয়নি একটি চার্জশিটও (অভিযোগপত্র)। ফলে বিচার পাওয়া নিয়ে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রংপুরের কোতোয়ালি থানায় ছয়টি হত্যা মামলা করেন নিহতদের স্বজনরা। এসব মামলায় ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের তালিকায় রংপুর মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার, ডিআইজি, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে।
পুলিশ এখন পর্যন্ত সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদসহ ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কোনো শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেনি। ৬টি মামলার মধ্যে ৪টি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে দুই বছরেও তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ স্বজনদের।
মামলার অগ্রগতির বিষয়ে রংপুর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, আমরা তদন্তে গুলিবর্ষণকারীদের শনাক্ত করেছি। একজন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার অনুমতি আমরা পেয়েছি। তবে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। ৫ মাস ধরে আমরা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমতি পেলেই এক মাসের মধ্যে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া সম্ভব হবে।

যা ঘটেছিল ১৯ জুলাই
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। স্বাভাবিক দিনের মতো সকাল হলেও গত দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের চিহ্ন জায়গায় জায়গায়। বিকেল ৩টায় নগরীর গ্র্যান্ড হোটেল মোড়স্থ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জেলা ও মহানগর বিএনপি। এরপর কয়েক হাজার নেতাকর্মী মিছিলে যোগ দেন। তাদের মিছিলের সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার ছাত্র-জনতা অংশ নেন।
বিকেলে মিছিলটি সিটি করপোরেশনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে সেখানে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পুলিশ ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেদিন ছিল বেশ ক্ষুধার্ত। তাদের ছোড়া রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পুলিশের অস্ত্রের সামনে ইটপাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। এরই একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা মারমুখী হয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে।
এতে ঘটনাস্থলে নগরীর পূর্বশালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, পূর্ব গণেশপুরের স্বর্ণ শ্রমিক মোসলেম উদ্দিন, ফল বিক্রেতা নিউ জুম্মাপাড়ার মেরাজুল ইসলাম ও পূর্ব শালবনের বাসিন্দা ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল তাহিরের মৃত্যু হয়।
এ সময় শতাধিক আহতকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত অনেকে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়ি ফিরে যান। এ সংঘর্ষে নগরীর জুম্মপাড়ার আবেদ আলী চোখ হারান। সেই সাথে অসংখ্য ছাত্র-জনতার শরীরে গুলি লাগে।
এদিন রাজধানী ঢাকার গ্রীন রোডে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। ফ্রিল্যান্সিং সাংবাদিক প্রিয় রংপুরের গুপ্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা। আজ শহীদ মেরাজ, মিলন ও সাজ্জাদের স্মরণে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে মহানগর যুবদল।
এর আগের দিন ১৮ জুলাই বিকেলে নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশা চালক ঘাঘট পূর্ব পাড়ার মানিক মিয়া শহীদ হন। ওইদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস, জাতীয় শ্রমিক লীগ অফিস, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়, তাজহাট থানা, নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরকে
