রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধার (৩০) বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডাক বিভাগ।
পলাতক শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা পোস্ট অফিসে আগত গ্রাহকদের মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে বিভিন্ন সময়ে সাদা স্লিপের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা ডাকঘরের সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন তিনি।
বিষয়টি জানাজানি হলে গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তে এসে শিহাবকে ডাকঘরে পেলেও তাকে পুলিশে সোপর্দ না করে ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই তিনি পলাতক। তার বাড়িতে খোঁজ নিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা ডাকঘরে এসে তাদের অর্থ ফেরতের দাবি জানাচ্ছেন।
জানা যায়, লেটার রাইটার শিহাব মৃধা সম্প্রতি বিদায়ি পোস্ট মাস্টার বিকাশ বিশ্বাস ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজস করে অর্ধশতাধিক গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক পত্রে ঘটনাটি তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে (তদন্ত) সদস্য সচিব, ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল (তদন্ত), দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।
কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিধি-বিধানের অপর্যাপ্ততা বা পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি সংঘটিত হয়ে থাকলে তা সংশোধন, নিরসন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষে যুক্তিসংগত প্রস্তাব বা সুপারিশসমূহ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের এক কর্মকর্তা বলেন, শিহাবের একার পক্ষে এত টাকা আত্মসাৎ সম্ভব নয়। এ ঘটনায় পোস্ট মাস্টারসহ অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জড়িত থাকতে পারেন।
মোনালিসা ইমাম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, চলতি মাসে ২ লাখ টাকার মেয়াদি হিসাব খুলতে পোস্ট অফিস আসলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা আমার লেখালেখিসহ যাবতীয় কাজ করে দেন। পরে ডাকঘরে এসে জানতে পারি, আমার নামে কোনো হিসাবই খোলা হয়নি।
আরেক ভুক্তভোগী আফজাল হোসেন বলেন, ডাকঘরের ওপর আস্থা রেখেই টাকা জমা দিয়েছিলাম। এখন শুনছি আমাদের নামে কোনো হিসাব নেই। জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে আমরা দিশেহারা। আমরা দ্রুত টাকা ফেরত ও জড়িতদের শাস্তি চাই।
সালমা বেগম নামে আরেকজন বলেন, ডাকঘরে বসেই সব কাগজপত্র পূরণ করতেন শিহাব। তাই তাকে বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছিলাম। এখন তিনি পালিয়ে গেছেন।
ভুক্তভোগী সোহেল রানা বলেন, পোস্ট অফিস সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে এসে প্রতারণার শিকার হয়েছি।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ফেরত দেওয়া হক। পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সদ্য বিদায়ি পোস্টমাস্টার বিকাশ বিশ্বাস জানান, শিহাব কীভাবে এত টাকা আত্মসাৎ করেছে, সে বিষয়ে তার জানা নেই।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি সরকারি কর্মচারী নন। ডাক অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের কর্মী বিভিন্ন ডাকঘরে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রের বই না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
তিনি আরও বলেন, আমি ৬ জুলাই এই ডাকঘরে যোগদান করি। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং সেখান থেকে খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। বর্তমানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এমএমবি
