ঝালকাঠির বুক চিরে প্রবাহিত ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ সুগন্ধা নদী একদিকে যেমন জেলার নৌযোগাযোগ, মৎস্য সম্পদ আহরণ, অর্থনীতি ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি, অন্যদিকে প্রতিবছর ভয়াবহ নদীভাঙনের মাধ্যমে শত শত পরিবারের জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ।
ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে প্রবাহিত এই নদীর তীরবর্তী মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নতুন আতঙ্ক। বছরের পর বছর নদীর আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, মসজিদ, গাছপালা ও মানুষের আজীবনের সঞ্চয়।
বিশেষ করে নলছিটি উপজেলার বারইকরণ, সরই, তিমিরকাঠি, দরিরচর, খোজাখালী, মল্লিকপুর, সিকদারপাড়া, বহরমপুর, ষাটপাকিয়া, কাঠিপাড়া, অনুরাগসহ ১০টিরও বেশি গ্রামে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে বারইকরণ, সরই, খোজাখালী, দরিরচর, তিমিরকাঠি ও সিকদারপাড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির প্রবল স্রোত ও তীব্র ঢেউয়ের কারণে কয়েকগুণ বেড়ে যায় ভাঙনের গতি।

ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান হোসেন রবিনের মতে, প্রাকৃতিক কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, তীর সংরক্ষণে স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারের চাপ ভাঙনকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। নদীর তীর দুর্বল হয়ে পড়ায় বর্ষাকালে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি ও আবাদি জমি।
নদীপারের মানুষের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একইভাবে ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে একবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার পর আবারও ভাঙনের কবলে পড়তে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
ভাঙনের কারণে শুধু ঘরবাড়ি নয়, হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, পানের বরজ, ফলদ ও বনজ গাছ, মাছের ঘের, কাঁচা-পাকা সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, পারিবারিক কবরস্থান। অনেক পরিবার এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হয়েছেন। নদীভাঙনের কারণে শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের, জীবিকা হারাচ্ছেন কৃষক ও দিনমজুররা, বাড়ছে দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা।

সরই গ্রামের আমেনা বেগম বলেন, আমার স্বামীর কবরটাও নদীতে চলে গেছে। এখন মানুষ মরলে কোথায় কবর দেব, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।
কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি মুছছিলেন তিনি। জানান, নদীর ধারে ছিল তাদের পৈতৃক বাড়ি। ভাঙনে সেটি হারিয়ে একটু দূরে নতুন ঘর তুললে সেটিও নদীতে বিলীন হয়েছে। শেষ সম্বল ভিটেমাটি, গাছপালা সব হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে বসবাস করছেন। তার অভিযোগ, এত বড় ক্ষতির পরও কেউ তাদের খোঁজ নিতে আসেনি।
নদী ভাঙন এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন হাওলাদার বলেন, আমার জন্ম থেকেই দেখছি এই ভাঙন চলছে। কিন্তু ভাঙন রোধে স্থায়ীভাবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই ভাঙনে শত শত পরিবার বসতভিটা, পানের বরজ, গাছপালা ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়েছে। তার ঘর এখন নদীর একেবারে কিনারায়। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন ঘর নদীতে তলিয়ে যায়, সেই ভয় নিয়েই দিন কাটছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

মগড় ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের ইউসুফ হাওলাদার জানান, আগে তাদের এলাকায় ২০ থেকে ৩০টি পরিবার ছিল। এখন মাত্র দুই-তিনটি পরিবার টিকে আছে। তিনি বলেন, আমরা কোনো সাহায্য চাই না, শুধু নদীভাঙনটা বন্ধ করে দেওয়া হোক।
সরই গ্রামের জামাল ফকির জানান, তার বাপ-দাদার ভিটা এখন সুগন্ধা নদীর মাঝখানে। অনেক কষ্ট করে নতুন বাড়ি করলে সেটিও নিরাপদ নয়। বছরের পর বছর ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাননি।
অবসরপ্রাপ্ত তহসিলদার হাজী আব্দুল হক তালুকদার বলেন, যে জায়গায় একসময় অসংখ্য মানুষের বসতঘর ছিল, এখন সেখানে লঞ্চ চলাচল করে। নদী ধীরে ধীরে আমার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। ভবিষ্যতে নিজের ভিটায় থাকতে পারব কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় আছি।
ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা বলেন, নদীভাঙনে এলাকার অনেক মানুষ বাপ-দাদার ভিটার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। তিনি দ্রুত নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো বলেন, সুগন্ধা নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও কষ্টের বিষয়টি আমি জানি। ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর কাজের উদ্বোধন করেছি। এটি ছিল তাৎক্ষণিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এখন আমরা বৃহত্তর প্রকল্পের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছি। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে নদীতীরবর্তী ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
ঝালকাঠির নদীপারের মানুষের একটাই দাবি, আর আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর নদীশাসনের মাধ্যমে সুগন্ধার ভয়াল ভাঙন রোধ করা হোক। তাদের ভাষায়, ভিটেমাটি হারালে আবার ঘর তোলা যায়, কিন্তু পূর্বপুরুষের কবর, শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের ইতিহাস আর শেকড় একবার হারিয়ে গেলে তা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।
মো. শাহীন আলম/এএমকে
