দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আলমারিতে যত্ন করে রাখা আছে আবিরের ব্যবহৃত পোশাক, সাবান, প্রসাধনী আর প্রিয় কিছু জিনিস। ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন মা পারভীন সুলতানা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত আবদুল্লাহ আল আবিরের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আবারও নতুন করে ফিরে এসেছে সেই শোকের দিনগুলোর স্মৃতি।
আজ সোমবার (২০ জুলাই)। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতেও বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের বাড়িতে শোকের আবহ কাটেনি। পরিবারের সদস্যরা এখনও গভীর বেদনায় তাকে স্মরণ করছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন আবির। গুলি তার পেট ভেদ করে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ১১ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও ২০ জুলাই সকালে তিনি মারা যান। ২১ জুলাই রাতে নিজ গ্রাম ক্ষুদ্রকাঠীতে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
আবির বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের মিজানুর রহমান বাচ্চু ও পারভীন সুলতানার একমাত্র ছেলে। তার বাবা বরিশাল জননিরাপত্তা অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ঢাকায় বড় বোন মারিয়া আক্তারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন আবির।

ভগ্নিপতি মহিমুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় সেখানে সাপোর্ট স্টাফ হিসেবে চাকরি পান তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার আগের দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৯ জুলাই দুপুরে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আবির তার বোনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বাসায় জাতীয় পতাকা আছে কিনা। পতাকা না পেয়েই তিনি বেরিয়ে যান মিছিলের উদ্দেশ্যে।
আবিরের বোন মারিয়া আক্তার বলেন, আমি বারবার তাকে যেতে নিষেধ করেছি। কয়েকবার ফোন করে বাসায় ফিরতে বললেও সে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফোন করে জানায়, আবির গুলিবিদ্ধ হয়েছে, দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাত ৯টার পর হাসপাতালে পৌঁছে দেখি, তার পেটে ব্যান্ডেজ করা। চিকিৎসকেরা জানান, গুলিতে পেটের ভেতরের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। তখনও সে কথা বলছিল এবং পাশে থাকা আহতদের খোঁজ নিচ্ছিল।
মারিয়া জানান, গুলিতে আবিরের একটি কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকেরা সেটি অপসারণ করেন। কিন্তু ভেতরের রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ১১ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
তিনি বলেন, আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই। যে উদ্দেশ্যে আমার ভাই জীবন দিয়েছে, সেই উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নও সরকারের কাছে দাবি করছি।
বাবা মিজানুর রহমান বাচ্চু বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। তার আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। একজন বাবা হিসেবে ছেলেকে হারানোর কষ্ট কখনো শেষ হবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, তার আত্মত্যাগের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা আবির হত্যার বিচার চাই।
স্থানীয়রা জানান, আবির শান্ত, ভদ্র ও মিশুক স্বভাবের ছিলেন। গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে তিনি এখনও একজন বিনয়ী তরুণ হিসেবেই বেঁচে আছেন। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পরিবারের পাশাপাশি এলাকাবাসীও তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। বিভিন্ন মসজিদে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করা হয়েছে।
আবিরের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি তাদের খোঁজ নেননি। শুধু প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফরে এলে তাদের সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছিল। তারা বলেন, আমরা স্বজন হারিয়েছি। আমাদের নিয়ে রাজনীতি করবেন না।
এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, আমরা যথাসম্ভব শহীদ পরিবারের খোঁজখবর রাখছি। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিগুলোতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মানের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমাদের উপজেলায় ৩ জন শহীদ রয়েছে। তাদের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ির রাস্তা, টিউবওয়েল বসানোসহ সার্বিক উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
এসএইচএ
