রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের কাউরিয়া, বসুপাড়া ও ধেরওয়িল গ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ড্রেন নির্মাণের মাত্র সাত দিনের মাথায় ধসে পড়েছে। এ ঘটনায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, নির্মাণসামগ্রীর নয়, মিস্ত্রির কাজের ত্রুটির কারণেই ড্রেনটি ভেঙে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের বিবিজি (BBG) বিশেষ কিস্তির আওতায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করে তিন গ্রামের কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণের মাত্র সাত দিনের মধ্যেই ড্রেনটির একাধিক অংশ ধসে পড়েছে। কোথাও দেয়াল ভেঙে পাশের অংশের ওপর হেলে পড়েছে, আবার কোথাও বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনের মুখে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি বের হতে পারছে না। ফলে আবারও বিল ও ফসলি জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় রড কিংবা পিলার ছাড়াই দায়সারা কাজ করায় সামান্য বর্ষণের পানির চাপেই ড্রেনটি ধসে পড়ে।
কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের বিলের পানি বের করার জন্য চেয়ারম্যান একটি ড্রেন নির্মাণ করে দেন। কিন্তু নির্মাণের সাত দিনের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়ে। এখন বৃষ্টির পানি মাঠে জমে থাকায় আমরা চাষাবাদ করতে পারছি না।
আরেক কৃষক মোজাহার হোসেন বলেন, এখানে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি রয়েছে। জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সাত দিনের মাথায় ড্রেনটি ধসে যাওয়ায় আবারও জমিতে পানি জমে যায়। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ রহমান বলেন, কৃষকদের কথা চিন্তা করে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও নিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো রড বা পিলার ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে কাজ করায় পুরো ড্রেনটি অল্প সময়েই ধসে পড়ে।
এদিকে, নির্মাণকাজে যুক্ত এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান প্রায় প্রতিদিনই কাজের স্থানে উপস্থিত থাকতেন এবং তার নির্দেশনাতেই কাজ হয়েছে। চেয়ারম্যানের নিজস্ব ইটভাটার নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে রামকান্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিব মোল্লা বাবু বলেন, আমি নির্মাণসামগ্রীতে নিম্নমানের কোনো কিছু ব্যবহার করিনি। মিস্ত্রির কাজের ত্রুটি থাকতে পারে। ড্রেনটি যেহেতু ভেঙে গেছে, আমরা দ্রুত মেরামত করে দেব।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নিরুপমা রায় বলেন, ড্রেন ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। উপজেলা প্রকৌশলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয়েছে। ড্রেনটি পুনরায় মেরামত করা হবে। তবে তদন্তে অনিয়ম বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, কাউরিয়া, বসুপাড়া ও ধেরওয়িল গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে শত শত একর জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল নতুন ড্রেন নির্মাণের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। কিন্তু নির্মাণের মাত্র সাত দিনের মাথায় ড্রেনটি ধসে পড়ায় সেই আশা ভেঙে গেছে। এখন আবারও জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন এলাকার কৃষকরা।
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরকে
