বিজ্ঞাপন

মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ নিরাপত্তাকর্মী, ১০ মাসেও মেলেনি সন্ধান

মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ নিরাপত্তাকর্মী, ১০ মাসেও মেলেনি সন্ধান

ফেনীর ফুলগাজীর গথিয়া খালটি এখনো আগের মতোই আছে। বর্ষায় টইটম্বুর, ভাটায় শান্ত। প্রতিদিনের মতো এখনো সেখানে মানুষ মাছ ধরে। শুধু একজন আর ফেরেননি। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর সকালে উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের মাওলানা সমাজ এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাইয়ুম (৫৮) জাল হাতে ওই খালে মাছ ধরতে যান। দুপুরে ধরা মাছ বড় ভাইয়ের মাধ্যমে বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ।

এরই মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ১০ মাস। ফিরে এসেছে তার ব্যবহৃত জাল, কিন্তু মানুষটির কোনো সন্ধান মেলেনি। খোলেনি তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য।

পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে না ফেরায় পরদিন স্থানীয় জেলে, এলাকাবাসী ও ফুলগাজী ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা খালজুড়ে তল্লাশি চালান। ফুলগাজী ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর মালাকার চন্দ্রের নেতৃত্বে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার খোঁজাখুঁজিতেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। পরে তার স্ত্রী সালমা বেগম ফুলগাজী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

নিখোঁজের এক মাস পর গত বছরের ২৯ অক্টোবর এ ঘটনার নতুন মোড় নেয়। প্রতিবেশী আবদুল হাই একই খালে মাছ ধরতে গিয়ে কাইয়ুমের ব্যবহৃত জাল উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের দাবি, নিখোঁজ হওয়ার সময় জালটি তার হাতের সঙ্গে বাঁধা ছিল। ফলে এক মাস পর সেটি কীভাবে খুলে খালের পানিতে ভেসে উঠল, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। জাল উদ্ধারের পর আবারও খালে তল্লাশি চালানো হলেও তার কোনো সন্ধান বা নতুন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন ফেনী শহরের সাউথইস্ট ব্যাংকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন আবদুল কাইয়ুম। পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর গত বছরের ১ অক্টোবর ফেনী রেলগেট এলাকার ইসলামী ব্যাংকে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই নতুন কর্মজীবন আর শুরু হয়নি। ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতীক্ষা শেষ হয়নি পরিবারের। 

আবদুল কাইয়ুমের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, মরে গেলেও যদি তার হাড়গোড়টা পেতাম, তাহলে অন্তত জানতাম মানুষটা আর নেই। এই না পাওয়া, না জানার কষ্টটাই সবচেয়ে বড়। ঘটনার পর তখনই থানায় অভিযোগ দিয়েছি, অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু কোনো খবর পাইনি। সংসারে এখন আয় করার কেউ নেই। ৮ বছরের পালক সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন মিয়াজি বলেন, ১০ মাস পার হয়ে গেল, কিন্তু মানুষটার কোনো খোঁজ নেই। জাল পাওয়া গেল, মানুষটাকে আর পাওয়া গেল না। বিষয়টি এখনো আমাদের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।

নিখোঁজ কাইয়ুমের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম বলেন, কাইয়ুম খুবই সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। কী হয়েছিল, সেটি আজও কেউ বলতে পারে না। তার স্ত্রী ও সন্তান এখন অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন।

বেলাল হোসেন নামে এক প্রতিবেশী বলেন, জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন তিনি। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর মামলায় দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর নিঃস্ব অবস্থা থেকে আবার নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো কষ্টের দিন শেষ হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করেই মানুষটা হারিয়ে গেলেন।

ফুলগাজী ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের বর্তমান ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর মো. তারেকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সময় ডুবুরি দল নিয়ে খালে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি এবং জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালককে অবহিত করেই অভিযান সমাপ্ত করা হয়। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুলগাজী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনাটি আমি এই থানায় যোগদানের আগের। খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানবো।

তারেক চৌধুরী/আরএআর

বিজ্ঞাপন