বর্ষার মৌসুমে তিস্তায় চলছে তীর্ব্র স্রোত, যেন এক উন্মাদ নদী। তিস্তার প্রচণ্ড স্রোতে প্রায়ই ভেঙে যায় ঘরবাড়ি, ফসলের জমি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আবার সেই নদী শুকনো মৌসুমে রূপ নেয় মরুভূমির বালুচরের মতো, কোথাও থাকে হালকা পানি, কোথাও শুকনো খাল, আবার কোথাও থাকে বিশুদ্ধ বালুর বিস্তীর্ন চর।
এই তিস্তা নদী এক সময় ছিল উত্তরাঞ্চলের মুখের হাসি। কালক্রমে যা পরিণত হয়েছে দুঃখের সাগরে। লালমনিরহাট জেলার পাঁটটি উপজেলার তিস্তার কূলঘেষা মানুষ বছরের পর বছর দুঃখের সাগরে বসবাস করে বর্ষার পানি আর শুষ্ক বালুতে জীবন অতিবাহিত করছে।
তবে এই বর্ষার ও শুকনো মৌসুমের দুইটি রূপ ছাড়াও ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হয়েছে আরও ভিন্ন রূপ। দেখা দিয়েছে নদীর নাব্যতা হ্রাস, চর জাগা, জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং জীবিকা হারানোর মতো ভাঙন।
তিস্তার বুকে বর্ষায় পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠে অসংখ্য চর। এই সব চরের কোথাও কোথাও ভুট্টা, বাদাম, তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া, আলুসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি উৎপাদন করা হয়ে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত কোনো কোনো চরে পানির অভাবে চাষাবাদ বন্ধ থাকে আবার কোথাও পানির অভাবে ভালো ফলন পান না কৃষকরা।
তিস্তা নদীর জেলে রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীতে আগের মতো মাছ নেই। আগে মাছ ধরে সুখেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারতাম, এখন আগের মতো মাছ নেই। তিস্তার বুকে আগে অসংখ্য নৌকা ছুটে চলতো, এখন অনেক নৌকা কিনারে পরে থাকে।
তিস্তা এলাকার রমজান আলী বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলে ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাই। আমাদের নদীর পাড়ের এমন কিছু কিছু পরিবার আছে যারা বহুবার নিজেদের মাথাগোজার বসতভিটা হারিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘর বেধেছে। বারবার ভাঙনে বারবার বসতভিটা পরিবর্তন করায় শিশুদের পড়াশোনা এবং কৃষকের কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যঘাত ঘটেছে।
মহিশখোচা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য আজহার আলী বলেন, তিস্তার সমস্যা এখন শুধু তিস্তা নদীতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন আমাদের নদী এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তিস্তাপাড়ের মানুষের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের আলোচিত তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীশাসন, নদী ভাঙন প্রতিরোধ, সেচ-ব্যবস্থার উন্নয়ন, নাব্যতা ফিরিয়ে আনাসহ নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এবং সৃষ্টি হতে পারে হাজার বেকারের কর্মসংস্থান।
তিনি আরও বলেন, তিস্তার দুই রূপ আজ বহুরূপ ধারন করেছে। এই নদী কখনো আশীর্বাদ আবার কখনো অভিশাপে পরিণত হয়। এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের হৃদয়ে একটাই প্রত্যাশা, দ্রুতই বাস্তবায়ন হোক তিস্তার মেগা প্রকল্প।
মহিশখোচা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, তিস্তা এখন শুধু তিস্তাপারের মানুষের দুঃখ না, এটা পুরো উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুঃখের কারণ হয়েছে, তিস্তার মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সেখানে প্রচুর কৃষি জমি উদ্ধার হবে, পাশাপাশি মানুষের বসতভিটা হারিয়ে যাওয়ার আতংক দূর হবে এবং তিস্তা অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠে হাজার হাজার বেকারের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
‘তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলনের প্রধান নেতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা এক সময় সমৃদ্ধ অঞ্চল ছিল, এখানে মানুষের ডুলি ভরা ধান গোয়াল ভরা গরু ছিল। মানুষের মুখে ছিল ভাওয়াইয়া গান। সেই তিস্তা পাড়ে এখন শুধু হাহাকার। পাশের দেশের পানি বৈষম্যর কারণে তিস্তা নদী শুকনো মৌসুমে মরুভূমি হয়ে যায়। কালক্রমে তিস্তা এখন মানুষের কান্না হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তিস্তাপারের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাগব করতে বিগত দিনে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন করেছি, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ স্থানের নেতা-কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। সর্বপরি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে বলেছিলেন, “জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ক্ষমতায় আসলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো”। আমরা ক্ষমতায় এসেছি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।
এএমকে
