বিজ্ঞাপন

পা দিয়ে লিখেই কামিল পাস, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিলার

পা দিয়ে লিখেই কামিল পাস, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিলার

জন্ম থেকেই নেই দুই হাত। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে কখনোই নিজের পরিচয় হতে দেননি নিলা খাতুন। দুই পা দিয়ে লেখা, দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করা এবং একের পর এক শিক্ষাজীবনের ধাপ পেরিয়ে এবার তিনি অর্জন করেছেন কামিল (মাস্টার্স সমমানের) ডিগ্রি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায়ের গল্পে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেকের অনুপ্রেরণা।

দিনমজুর উসমান গনি ও শাহিনুর বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নিলা জন্ম থেকেই দুই হাতবিহীন। কিন্তু এই বাস্তবতা তাকে কখনো হার মানাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে লেখাপড়ার প্রতিটি ধাপে তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। প্রথম দিকে মায়ের সহযোগিতায় স্কুলে যাতায়াত করলেও ধীরে ধীরে নিজের সব কাজ নিজেই করতে শিখে ফেলেন।

পা দিয়ে কলম ধরা, খাতা লেখা, পরীক্ষা দেওয়া সবই এখন তার কাছে স্বাভাবিক। শুধু লেখাপড়াই নয়, ঘরের নানা কাজও করেন তিনি। পা দিয়েই তরকারি ও মাছ কাটেন, উঠান ঝাড়ু দেন, এমনকি টিউবওয়েল চাপিয়ে পানি তোলেন।

শিক্ষাজীবনেও একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন নিলা। ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৭০ এবং ২০১৯ সালে আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৮৬ অর্জন করেন। পরে ফাজিল সম্পন্ন করে সিরাজগঞ্জ আহমেদ কামিল মাদরাসা থেকে মাস্টার্স (কামিল) ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিলা খাতুন বলেন, শিক্ষকতা আমার সবচেয়ে প্রিয় পেশা। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষক নিবন্ধনের (এনটিআরসিএ) জন্য আবেদন করেছি। একটি সরকারি চাকরি পেলে আমার দীর্ঘ সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে।

তিনি বলেন, ২০১৯ সালে আলিম পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখে জিপিএ ৩.৮৬ পেয়েছি। ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৭০ নিয়ে পাস করি। ২০২২ সালে ফাজিলে ২.৯২ সিজিপিএ অর্জন করি। পরে কামিল প্রথম বর্ষে ২.৯৮ এবং দ্বিতীয় বর্ষে ২.৯২ পেয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি।

মা শাহিনুর বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার খুব ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করার। অনেক কষ্টের মধ্যেও সে হাল ছাড়েনি। এখন চাই, ও যেন একটা সরকারি চাকরি পায়।

অসুস্থ বাবা উসমান গনি বলেন, দিনমজুরি করে মেয়েকে পড়িয়েছি। মেয়েটা অনেক কষ্ট করে এতদূর এসেছে। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, তার যোগ্যতার মূল্যায়ন করে একটা কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হোক।

কামারখন্দ ফাজিল মাদরাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শমসের আলী বলেন, নিলা অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে যে সাফল্য সে অর্জন করেছে, তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার।

জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধকতাকে হার মানানো নিলার চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। শিক্ষক হয়ে তিনি শুধু নিজের জীবনের গল্পই বদলাতে চান না, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চান আত্মবিশ্বাস, সাহস আর সম্ভাবনার আলো।

নাজমুল হাসান/আরকে