বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহে বেড়েছে শিশু ধর্ষণ, ছয় মাসে ১০৩ মামলা

ময়মনসিংহে বেড়েছে শিশু ধর্ষণ, ছয় মাসে ১০৩ মামলা

ময়মনসিংহে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত জেলার ১৪টি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় ১০৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ জনই ১৮ বছরের নিচের শিশু ও কিশোরী। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ২২টি। তবে ১০৩টি মামলার মধ্যে বিচার শেষ হয়েছে মাত্র একটির।

সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ১৪ জুন ধোবাউড়া উপজেলায় বাড়ির পাশ থেকে নিখোঁজ হওয়া পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ পরে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে কংস নদীতে কাদার নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চার তরুণ আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, ফুল দেওয়ার কথা বলে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার পর দলবদ্ধভাবে যৌন নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ নদীর কাদায় পুঁতে রাখা হয়।

এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই জেলার গফরগাঁওয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, ঘটনার ভিডিও ধারণ এবং পরে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ভালুকায় বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে এক শিশুকে ধর্ষণ এবং ত্রিশালে মসজিদে পড়তে যাওয়া এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগও সামনে আসে।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ১০৩ জনের মধ্যে ৬৪ জন শিশু ও কিশোরী এবং ৩৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। এ সময় দুই শিশু ও তিন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধর্ষণ ও এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে মোট ৮১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে একটি ছেলে শিশুকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায়ও মামলা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত একই সময়ে ধর্ষণের মামলা হয়েছিল ১০৬টি। তখন শিশু ও কিশোরী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ৪২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ২২টি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি মনিরা বেগম বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হলেও গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচারের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক তদারকির অভাব, অভিভাবকদের নজরদারির ঘাটতি, মাদকাসক্তি এবং অশ্লীল ও বিকৃত পর্নোগ্রাফিতে সহজ প্রবেশাধিকার ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সন্দেহজনক কোনো ঘটনা দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০৩টি মামলার মধ্যে ১১টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মাত্র একটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের ১০৬টি মামলার মধ্যে ৭৪টির অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হলেও কোনো মামলার রায় হয়নি।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় অভিযোগপত্র দাখিলে বিলম্ব হয়। অনেক সময় চিকিৎসকের বদলি বা ছুটির কারণেও মেডিকেল রিপোর্ট পেতে দেরি হয়। তবে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ধোবাউড়ায় পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে যৌন নির্যাতন ও হত্যার মামলায় মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার নজিরও তৈরি হয়েছে। গত ৯ জুলাই ময়মনসিংহের পৃথক দুটি আদালত ওই ঘটনায় তিন তরুণকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক কিশোরকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত নিহত শিশুর বাবা-মা দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।

জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। তার মতে, প্রতিটি ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

সাখাওয়াত সুমন/আরকে