বিজ্ঞাপন

পিরোজপুরে ৪ নদীর ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা

‘এই নদীতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে’

‘এই নদীতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে’

পিরোজপুরে বর্ষা মানেই নদীপাড়ের মানুষের জন্য নতুন আতঙ্ক। কচা, বলেশ্বর, কালীগঙ্গা ও সন্ধ্যা নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতি বছরই হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। বছরের পর বছর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই নিয়েছে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছেন। তবু স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।

মেঘ জমলেই উৎকণ্ঠা বাড়ে সদর উপজেলার হুলারহাট দেওনাখালি এলাকার ৮০ বছর বয়সী বুরুজান বিবির। বৃষ্টি নামার আগেই তিনি ছুটে যান কচা নদীর পাড়ে। প্রতিবারই মনে শঙ্কা জাগে—আর কতটুকু জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেল? কয়েক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে নদী এখন এসে দাঁড়িয়েছে তার বাড়ির একেবারে পাশে।

বুরুজান বিবি বলেন, এই নদীতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার অনেক জায়গা ছিল, নদীভাঙনে সব হারাইছি। এখন একটি ঘর আছে। সরকার যদি আমাদের দিকে না চায়, সেটাও থাকবে না। এই গ্রামে ভালো বেড়িবাঁধ দরকার। বেড়িবাঁধ হলে একটু শান্তিতে থাকতে পারব।

একই উপজেলার কৈবর্তখালী গ্রামের নদীপাড়ের মসজিদের ইমাম রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের দুঃখের শেষ নাই। এত নদীভাঙন হয়, কিন্তু কেউ দেখে না। মাইয়া-পোলারা ঠিকমতো স্কুল-মাদ্রাসায় যেতে পারে না। এ বছর মনে হয় মসজিদটাও নদীতে চলে যাবে। এলাকায় ভালো একটি সাইক্লোন সেন্টারও নাই। সরকারের কাছে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।

জেলে আজমল খান বলেন, আগে এই এলাকায় অনেক মানুষ থাকত, এখন জায়গা-জমি নদীতে চলে যাওয়ায় অনেকেই চলে গেছেন। জোয়ার এলে সব পানিতে তলিয়ে যায়। বন্যার সময় কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার কুমিরমারা, হুলারহাট ও দেওনাখালি, নেছারাবাদ উপজেলার ছারছিনা, কাউখালী উপজেলার আমড়াঝুড়ি ফেরিঘাট, মঠবাড়িয়ার খেতাছিরা ও মাঝেরচর এবং ইন্দুরকানী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নদীভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পে উঠেছে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে অন্যত্র চলে গেছে। ভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবারগুলি।

সদর উপজেলার কুমিরমারা এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, এই নদীর পাড়ে আমার অনেক জমি ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এখন অর্ধেক হয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ভাঙা থাকায় সামান্য পানি বাড়লেই জমিতে পানি ওঠে। ৭-৮ বছর ধরে জমিতে চাষ করতে পারি না। আগে নদীর পাড়েই ঘর ছিল, এখন ভেঙে দূরে ঘর করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাশেদ খান বলেন, জেলায় ছয়টি পোল্ডারে ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। কিছু স্থান এখনো অরক্ষিত। কোথাও ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কচা, বলেশ্বর ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙন রোধে সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি) সমীক্ষা চলমান রয়েছে। সমীক্ষা শেষে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, নদীবেষ্টিত পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় সব এলাকাই কোনো না কোনোভাবে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে ছয়টি পোল্ডারে প্রায় ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ থাকলেও অনেক স্থানে বাঁধ না থাকা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদীতীরবর্তী জনপদ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

বছরের পর বছর নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল হারাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর নদীশাসনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এমএমবি