বিজ্ঞাপন

কার্পেটিংয়ের নামে সড়কের ইট তুলে বিক্রি, এমপির সঙ্গেও প্রতারণা

কার্পেটিংয়ের নামে সড়কের ইট তুলে বিক্রি, এমপির সঙ্গেও প্রতারণা

জামালপুরে ইটের সলিং করা সড়কে নতুন করে কার্পেটিং হবে- এমন ঘোষণা দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি), আইনজীবী ও এলাকাবাসীকে ডেকে জিলাপি খাইয়ে উদ্বোধন করা হয় রাস্তার ইট তোলার কাজ। এরপর এক মাস ধরে সড়কের ইট তুলে সরাসরি বিক্রি করে দেয় একটি চক্র। একই কৌশলে আরেকটি সড়কের ইট বিক্রি করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে তারা। পরে বেরিয়ে আসে প্রতারণার ঘটনা। 

ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতারা জড়িত আছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নিজেও প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগেও জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিয়া আটা থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কটিতে ইটের সলিং ছিল। এখন সেই সড়কে হাঁটাচলাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ১২ মে নতুন কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হবে বলে স্থানীয় সংসদ সদস্য, আইনজীবী ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে জিলাপি বিতরণ করে উদ্বোধন করা হয় রাস্তার ইট তোলার কাজ। 

এরপর আব্দুল মান্নান নামের এক ঠিকাদার এক মাস ধরে সবার সামনেই সড়কের ইট তুলে বিক্রি করে দেন। এরপর গত ১৬ জুন একই কৌশলে ওই ইউনিয়নের চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট খুলে বিক্রির চেষ্টা করে আব্দুল মান্নানসহ চক্রটি। এ সময় প্রকল্প-সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ওই দিন রাতে স্থানীয়রা চক্রের মূল হোতা মান্নানসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

এদিকে পরিকল্পিতভাবে পুরো সড়কের ইট সরিয়ে নেওয়ায় বর্তমানে সড়কটি প্রায় সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে আশপাশের কয়েক এলাকার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া, মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার অটো ও ভ্যানগাড়ি চালকরা। সড়কটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। অনেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বাড়ি থেকে গাড়ি বের করছেন না। 

এতে তাদের পরিবারের দৈনন্দিন বাজেটেও টানাটানি শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন- ওই এলাকার স্থানীয় বিএনপি নেতা, জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি ও রশিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী অ্যাডভোকেট জামিল হাসান তাপশ নিজে উপস্থিত থেকে পুরো ঘটনা ঘটিয়েছে। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজে উপস্থিত থেকে রাস্তার কাজ উদ্বোধন করলেও তিনি প্রকল্পের বিষয়ে কোনো খোঁজখবর কেন নেননি- সেই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, অ্যাডভোকেট জামিল হাসান তাপশ রাস্তার কাজ উদ্বোধনের কিছুদিন আগে তাদের বলেন যে, তিনি ঢাকা থেকে ওই রাস্তার জন্য চার কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসেছেন। তারপর তার নেতৃত্বেই শুরু হয় রাস্তার ইট তোলার কাজ এবং সেই ইট স্থানীয়দের কাছে প্রতি হাজার ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা করে প্রায় ২৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাডভোকেট জামিল হাসান তাপশ জানান,  রাস্তা নয় বরং স্থানীয় একটি ব্রিজের বরাদ্দের জন্য এলজিইডিতে স্থানীয়দের নিয়ে আবেদন করেছিলেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে চক্রসহ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি দ্রুত সড়ক দুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের রাস্তায় আগে ইট বিছানো ছিল। আমাদের যাতায়াতের কোনো সমস্যা ছিল না। আমরা খুব ভালোভাবেই যাতায়াত করেছি। মাঝখানে তাপস উকিল এসে আমাদের আশ্বাস দিলেন যে আমাদের রাস্তা কার্পেটিং করে দেবেন। তিনি বললেন রাস্তার জন্য চার কোটি ৫২ লাখ টাকার কাজ আসছে। আপনারা সঙ্গে থেকে সহযোগিতা করে রাস্তাটা করে নেবেন। তারপর সে নিজেই শাবল দিয়ে ইট তোলা শুরু করল। এখন শুনছি এই রাস্তার কোনো বাজেটই নেই। তাপস উকিল ইট চুরি করে পালিয়েছে। আর সংসদ সদস্য নিজে এসে উদ্বোধন করলেন, তার সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা ছিলেন। কিন্তু তিনি জানলেনই না এটার দরপত্র হয়েছে কিনা। আমাদের যাতায়াতে খুব সমস্যা হচ্ছে। 

হাজেরা বেগম নামে এক নারী বলেন, আমার বাপ-দাদা সবাই আওয়ামী লীগ করত। আমি জন্মের পর থেকেই বিএনপি করি। আমি জীবনে দুইটা ভোট দিয়েছি, দুইটা ভোটই বিএনপিকে দিয়েছি। আমাদের একটা আশা ছিল, আওয়ামী লীগ যেদিন চলে যাবে, সেদিন বিএনপি আসবে। এখন বিএনপি আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রাস্তার যে ইট ছিল, সেটা নিয়ে গেল। এরা এখন আমাদের এমন একটা দুঃখের মধ্যে ফেলেছে, এই দুঃখের আর শেষ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আমির উদ্দিন বলেন, আমরা তাপস উকিলকে দাওয়াত দিয়ে আমাদের মসজিদে নিয়ে এসেছিলাম। আমাদের মসজিদে প্রতি বছরই টাকা তোলার একটা বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠানে আমরা আরও কিছু মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলাম, তার সঙ্গে তাপস ভাইকেও দাওয়াত দিয়েছিলাম। তাপস উকিল এসে বলল যে, এই রাস্তার জন্য আমি তিন দিন ঢাকা গিয়েছি। ঢাকায় গিয়ে এই রাস্তার কাগজপত্র সব সম্পন্ন করে নিয়ে এসেছি। তারপর রাস্তার ইট নিয়ে গেল। আমরা এখন যে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছি, তাপস ভাই আর আসে না, কেউ আর আসে না আমাদের এখানে। কোনো নেতাকর্মীও আমাদের এখানে আসে না, খোঁজখবর নেয় না।

অ্যাডভোকেট জামিল হাসান তাপশ বলেন, আমার নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে আমি সেখানে বলেছিলাম যে আপনারা রাস্তা পাবেন, শিগগিরই আপনারা স্লুইচ গেট পাবেন। আমরা জানতাম না যে আমাদের বোকা বানানো হচ্ছে। আমাদের এই রাস্তার ইটগুলো নিয়ে পাঁচ-ছয়টা গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে একটা জনদুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেবে। আমিসহ যারা সেখানে ছিলাম, সবাই খুশিমনেই ছিলাম। এখন আমরা খোঁজখবর নিয়ে যতটুকু জানলাম, স্থানীয়ভাবে এই রাস্তার দরপত্রই হয়নি। আর ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি যেটা করেছি, সেটা ওই রাস্তার জন্য না। সেখানে একটা ব্রিজ আছে। ওই ব্রিজের জন্য স্থানীয়দের গণস্বাক্ষর নিয়ে আমি জামালপুর এলজিইডিতে জমা দিয়েছি। আমি ওই রাস্তার জন্য না, বরং ব্রিজের জন্য দৌড়াদৌড়ি করেছিলাম।

এ বিষয়ে এলজিইডি জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, জামালপুর জেলার সদর উপজেলাধীন রশিদপুর ইউনিয়নে সড়কের ইট তুলে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এটা ফেসবুক ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমি জেনেছি। এই সড়কে এলজিইডির আগে কোনো প্রকল্প ছিল না এবং বর্তমানেও কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ওই এলাকার মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ডিপিপি প্রণয়ন করে প্রকল্প প্রস্তাব সদর দপ্তরে পাঠানো হবে।

এদিকে নিজেদের অসাবধানতার কথা স্বীকার করে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, আমি সেদিন দিগপাইতে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে শুনি রাস্তার কাজ হচ্ছে, পরে সেখানে যাই। এই চক্রের মূল হোতাকে আমি জিজ্ঞাসা করি। সে বলে যে, এটা আমরা ঢাকা এলজিইডি থেকে কাজ নিয়ে এসেছি। ঢাকার ঠিকাদার কাজটা পেয়েছে, আমি তার কাছ থেকে সাব নিয়েছি। পরে আমি সেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দকে নির্দেশনা দিই যে, দীর্ঘদিন পর এই কাজ হচ্ছে, কাজটি যাতে যথাযথভাবে হয়, এবং সেখান থেকে আমরা চলে আসি। পরে আমি এলজিইডির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, এখানে দরপত্র হয়নি। এটা জানার পর আমার মনে সন্দেহ হয়। আমি আমার সহকর্মী আরাফাত রহমান শিশিরকে সেখানে পাঠাই। তিনি সরেজমিনে গিয়ে আমাকে নিশ্চিত করেন যে, এটা কোনো দরপত্র হয়নি। 

সংসদ সদস্য বলেন, এটা একটা চক্র, যারা দরপত্রের কথা বলে ইট তুলে বিক্রি করে দিচ্ছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দিই, সেখানে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে বলি। তারা সঙ্গে সঙ্গে তাদের পাকড়াও করেন। জনগণ সেখানে সমবেত হয় এবং একপর্যায়ে আমি পুলিশ পাঠাই। তাদের সেখান থেকে এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আমি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে বাদী করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করি এবং তাদের জেলহাজতে পাঠাই। এটা আসলে আমাদের কিছুটা অজ্ঞতা, কিছুটা অসাবধানতাও আছে।

বাঁধন হোসেন/আরএআর