বিজ্ঞাপন

জরুরি প্রয়োজনে রোগীর পাশে দাঁড়ান সাহাদাত ও তার ‘রক্ত যোদ্ধারা’

জরুরি প্রয়োজনে রোগীর পাশে দাঁড়ান সাহাদাত ও তার ‘রক্ত যোদ্ধারা’

ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের হাফেজডাঙ্গী গ্রামের মো. সাহাদাত হোসাইন (৩৩)। রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা এই তরুণ ২০১৮ সালের ১২ জানুয়ারি ৩৩ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড’।

শুরুতে সদস্য সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য ৯০। নিজের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন একদল ‘রক্ত যোদ্ধা’, যারা দিন-রাতের হিসাব না করে রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই ছুটে যান রোগীর পাশে।

শুরুর দিকে সংগঠনটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের মধ্যে। তবে প্রতিষ্ঠার মাত্র ৫ মাস পর সাহাদাত উপলব্ধি করেন, মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে জরুরি উপাদান রক্ত। অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্ত পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০১৮ সালের জুনে শুরু হয় সংগঠনটির স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি।

ব্যক্তিগত জীবনে সাহাদাত কিছুটা বোহেমিয়ান হলেও দায়িত্ববোধের জায়গায় তিনি একেবারেই ভিন্ন। বিশেষ করে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, স্বেচ্ছায় রক্তদানের ব্যবস্থা করা এবং সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি সবসময়ই নিষ্ঠাবান। তার বিশ্বাস, একটি ব্যাগ রক্ত শুধু একজন রোগীকেই নয়, একটি পরিবারকেও নতুন করে বাঁচার আশা ফিরিয়ে দিতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই নীরবে মানুষের পাশে থেকে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলছেন তিনি।

সাহাদাত বলেন, আমি নিজে গ্রামের মানুষ। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখেছি, শুধু রক্তের অভাবে কত মানুষ মারা যান। অথচ রক্ত এমন একটি উপাদান, যা কোনো গবেষণাগারে তৈরি করা যায় না বা ওষুধের দোকানে কেনা যায় না। একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকেই এটি সংগ্রহ করতে হয়। তাই এই কাজটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।

তিনি জানান, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি সুস্থ মানুষ ৩ মাস পরপর নিরাপদে রক্ত দিতে পারেন। বিষয়টি জানার পর সংগঠনের সদস্যদের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং সবাইকে নিয়মিত রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

সাহাদাতের ভাষায়, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই আমাদের উদ্দেশ্য। রক্তদান যেন কোনো লেনদেন না হয়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।

গ্রামের সাধারণ মানুষের রক্তের চাহিদার দিকে লক্ষ্য করে তিনি তার সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে জরুরি সভা করেন। ওই সভার পর প্রতিটি সদস্যের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে লিপিবদ্ধ করা হয়। সদস্যদের রক্ত দিতে উৎসাহিত করেন। এভাবেই শুরু হয় সাহাদাতের রক্তদান কর্মসূচি।

সংগঠনের সদস্যরা রক্তদানের ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা মেনে চলেন। যাতায়াত ব্যয় নিজেরা বহন করেন, রক্ত দিয়ে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা নেন না, এমনকি রোগীর স্বজনদের দেওয়া আপ্যায়নও যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন।

২০১৮ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যরা এক হাজারের বেশি ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন। রাত-বিরাতে কিংবা দূরবর্তী এলাকায়ও রক্তের প্রয়োজন হলে তারা বিনা দ্বিধায় ছুটে যান।

প্রচারণার চেয়ে সেবাকেই গুরুত্ব দেওয়ায় সংগঠনটির পরিচিতি মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়েছে। এখন শুধু চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন নয়, ফরিদপুর সদর, বোয়ালমারী, নগরকান্দা, সদরপুর, সালথাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং পাশের গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকেও নিয়মিত তাদের কাছে রক্তের আবেদন আসে।

রক্তদান ছাড়াও স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড মেধাবৃত্তি প্রদান, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা সদরের বাসিন্দা সুরাইয়া ইসলাম (২৭) জানান, তার প্রথম সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসলে শরীরে নানাবিধ জটিলতা দেখা দেয়। প্রথমে তিনি গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানে আসার পর জরুরি ভিত্তিতে তার রক্তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সন্ধানীসহ বিভিন্ন ডোনার প্রতিষ্ঠান ওই দ্রুততম সময়ে তাকে রক্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, সাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ডের একজন সদস্য হাসপাতালে এসে রক্ত দেন।

রক্ত গ্রহীতার স্বজন মো. রুবেল মোল্লা বলেন, যিনি রক্ত দিতে এসেছিলেন, তিনি যাতায়াত ভাড়াও নেননি। এমনকি তার জন্য কেনা ডাবের পানিও পান করেননি। এমন নিঃস্বার্থ মানুষ এখন খুব কমই দেখা যায়।

বোয়ালমারীর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী সুব্রত পাল (২৬) জানান, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত তার এক স্বজনের জন্য নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। সাহাদাতকে জানালেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডোনারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। সাহাদাতের এ কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার থাকে না।

হাফেজডাঙ্গী গ্রামের বাকিগঞ্জ মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হাসানুর রহমান বলেন, স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ডের প্রায় সব সদস্যই আমাদের গ্রামের। তারা নিয়মিত রক্তদান ও বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে যাচ্ছেন। শাহাদাত এ সংগঠনের প্রতিটি সদস্যই এক-একজন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

ফরিদপুরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বেনিফিসিয়ারি ফ্রেন্ডশিপ ফোরামের (বিএফএফ) নির্বাহী পরিচালক আ ন ম ফজলুর হাদী সাব্বির বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থেই এই সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অনেক সময় রক্তের ম্যাচিংয়ের খরচও নিজেরা বহন করেন। বর্তমান সময়ে যখন অনেক তরুণ বিপথে যাচ্ছে, তখন সাহাদাত ও তার সহযোদ্ধাদের এই উদ্যোগ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ।

জহির হোসেন/এমএমবি

বিজ্ঞাপন