বিজ্ঞাপন

১৪ বছরেই ধরেছিল সংসারের হাল, একমাত্র ভ্যান হারিয়ে দিশেহারা শাহাদৎ

১৪ বছরেই ধরেছিল সংসারের হাল, একমাত্র ভ্যান হারিয়ে দিশেহারা শাহাদৎ

যে বয়সে কাঁধে বইয়ের ব্যাগ থাকার কথা, সেই ১৪ বছর বয়সেই কাঁধে সংসারের বোঝা তুলে নিয়েছিল কিশোর শাহাদৎ হোসেন। পিতৃহীন সংসারে মা ও ছোট দুই ভাইবোনের মুখে খাবার তুলে দিতে ঋণের টাকায় কেনা ব্যাটারিচালিত ভ্যানটিই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু যাত্রীবেশী প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে সেই সম্বলটুকুও হারিয়ে এখন সে সর্বস্বান্ত। 

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পৌর শহরে যাত্রীবেশী দুই প্রতারক শাহাদাতের ভ্যান নিয়ে পালিয়ে যায়।

শাহাদতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাদের মূল বাড়ি বরিশালে হলেও পাঁচ বছর আগে বাবা সবুজ হোসেন ঢাকায় এক নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মারা যান। এরপর থেকে মা ও ভাইবোনদের নিয়ে শাহাদৎ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নের শালাইনগর গ্রামে নানার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সংসারে মা, সে ও ছোট দুই ভাইবোন। কিছুদিন আগে বড় বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভাবের কারণে শাহাদতের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। সংসারের হাল ধরতে বছরখানেক আগে একটি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৮০ হাজার টাকায় একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান কেনে সে। সেই ভ্যানের আয় দিয়েই কোনোমতে চলছিল সংসার আর ঋণের মাসিক ৯ হাজার টাকার কিস্তি।

ভুক্তভোগী কিশোর শাহাদৎ জানায়, মঙ্গলবার দুপুরে বাগাতিপাড়ার মালঞ্চি বাজার থেকে ৭০০ টাকা ভাড়ায় দুইজন যাত্রী তার ভ্যানে ওঠেন। তারা বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় যাওয়ার কথা বলেন। বনপাড়া গির্জা রোডের একটি গলির সামনে এসে একজন ভ্যান থেকে নেমে শাহাদৎকে বলেন, গলির ভেতর থেকে কিছু কার্টন আনতে হবে, তুমি সাথে চলো। এসময় অন্যজন ভ্যানেই বসে থাকেন। শাহাদৎ তার সাথে গলির ভেতরে গেলে ওই ব্যক্তি বলেন, কার্টনগুলো বড়, তুমি ভ্যানটা নিয়ে আসো।

কথামতো শাহাদৎ ভ্যান আনতে আগের জায়গায় ফিরে এসে দেখে, সেখানে ভ্যানসহ বসে থাকা লোকটি নেই। চারদিকে ছোটাছুটি করে সে বুঝতে পারে, প্রতারণার শিকার হয়েছে। উপার্জনের একমাত্র সম্বলটি হারিয়ে রাস্তার ধারে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে। তার কান্না দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটির কোনো সন্ধান পাননি।

খবর পেয়ে শাহাদতের মা জ্যোৎস্না খাতুন বনপাড়ায় ছুটে আসেন। ছেলের উপার্জনের একমাত্র বাহন হারানোর শোকে তিনিও ভেঙে পড়েন। পরে মা-ছেলে মিলে বড়াইগ্রাম থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

জ্যোৎস্না খাতুন বলেন, বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন তিন সন্তান নিয়ে আমার সংসার। ছেলের ভ্যান চালানোর আয় দিয়েই সব চলত। এখন ভ্যানও গেল, আয়ও বন্ধ। প্রতি মাসে ৯ হাজার টাকা কিস্তি কীভাবে দেব, সংসার চালাব কীভাবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমরা এখন পথে বসে গেলাম।

এ বিষয়ে বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে ভ্যানটি উদ্ধারের জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে বুধবার (২২ জুলাই) শাহাদাতের পাশে দাঁড়ান বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস। প্রাথমিকভাবে বড়াইগ্রাম উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের চাল, ডাল, তেল, চিনি ও লবণসহ খাদ্যসামগ্রীর একটি প্যাকেট দেওয়া হয়।

বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘটনাটি জানার পর প্রাথমিকভাবে আমরা শাহাদাতের পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রীর একটি প্যাকেট তুলে দিয়েছি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তার পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করব।

আশিকুর রহমান/এসএইচএ