সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পরিস্থিতি। বুধবার (২২ জুলাই) বিকেল থেকে জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসসহ নানা ধরনের যানবাহনের চালকদের ভিড় বাড়তে থাকে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় প্রতিটি পাম্পে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেও শত শত মোটরসাইকেল আরোহী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন শুধু কয়েক লিটার জ্বালানি তেল সংগ্রহের আশায়।
হঠাৎ করে কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া চাহিদার চাপে সন্ধ্যা ৮টার মধ্যেই জেলার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেনের মজুত সাময়িকভাবে শেষ হয়ে যায়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো সরবরাহ সংকটের চিত্র নয়, বরং গুজবের কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ একসঙ্গে তেল কিনতে আসায় সাময়িক এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পরিস্থিতির সত্যতা যাচাই করতে পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর একাধিক ফিলিং স্টেশন এবং ঢাকা পোস্ট-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা জানান, তাদের জেলায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও চাহিদা স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও তেলের সংকট বা অতিরিক্ত ভিড়ের তথ্য নেই। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের প্রভাবেই ঠাকুরগাঁওয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ তেল কিনতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিকেলের পর থেকেই ফেসবুকে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই সেসব পোস্ট হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এসব পোস্টের সত্যতা যাচাই না করেই অনেকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, যেকোনো সময় জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে। সেই আতঙ্ক থেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহে নেমে পড়েন অনেক চালক। সন্ধ্যা যত গড়িয়েছে, জেলার বিভিন্ন পাম্পে মানুষের উপস্থিতিও তত বাড়ছে।
সরেজমিনে শহরের একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি পাম্পের ভেতর থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কোথাও কোথাও যানবাহনের চাপ সামাল দিতে কর্মচারীদের হিমশিম খেতে দেখা যায়। অনেক চালককে তেল নেওয়ার জন্য ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে স্বাভাবিক প্রয়োজন নিয়ে আসা গ্রাহকদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
কয়েক মাস আগে তেল সংকটের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ আর অপেক্ষা করতে চাননি। অনেকে প্রয়োজন না থাকলেও আগাম তেল কিনে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্রাহকের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
মোটরসাইকেলচালক আরিফ বলেন, তেলের দাম আগেই বেড়েছে। এখন আবার যুদ্ধের কারণে সংকটের খবর শুনে তেল নিতে এলাম। প্রায় এক সপ্তাহ আগে শেষবার তেল নিয়েছিলাম। ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে এই আশঙ্কা থেকেই আগাম তেল সংগ্রহ করছি।
আরেক গাড়িচালক বলেন, ফেসবুকে সব জায়গায় তেলের সংকটের খবর দেখেছি। তাই তেল নিতে এসেছি। কাল যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে আমাদের জন্য কষ্টকর হবে। তাই আজই তেল নিয়ে রাখছি।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। স্বাভাবিক নিয়মেই তেল সরবরাহ হচ্ছে এবং বিক্রিও চলছে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিকের কয়েকগুণ বেশি গ্রাহক চলে আসায় কিছু স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন সাময়িকভাবে শেষ হয়ে গেছে। নতুন চালান পৌঁছালে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলেও তারা জানান।
তবে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থাও স্বাভাবিক আছে। কোনো ধরনের সংকটের তথ্য তাদের কাছে নেই। গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তেল কেনার কোনো প্রয়োজন নেই বলে তারা জানান। সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল কেনার আহ্বানও জানানো হয়।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কেউ গুজব ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেদওয়ান মিলন/এসএইচএ
