বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগীর চাপ, ২২ দিনেই ভর্তি ২২০ রোগী

ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগীর চাপ, ২২ দিনেই ভর্তি ২২০ রোগী

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছরের শুরু থেকে বুধবার (২২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৪৬ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২২ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন, যা জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ভর্তি হওয়া ১২৬ জনের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫ জন। এর মধ্যে জুনে ৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১ জন এবং চলতি জুলাই মাসে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতি বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে এবং বছরের অধিকাংশ রোগী এই সময়েই হাসপাতালে ভর্তি হন। গত বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিলেন ১৭৬ জন, মৃত্যু হয়েছিল মাত্র একজনের। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ২২৭ জন এবং ওই সময়ে মারা যান ২৮ জন।

বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৩৯ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ১০ জন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় একটি অংশ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় সিটি করপোরেশন নগরের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৪ জন, জুনে ৮ জন এবং ২১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৫৮ জন। চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ জন, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

স্পেশাল জোনের অন্যতম এলাকা নওমহলে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন নালায় আবর্জনা জমে পানি আটকে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকায় মশার উপদ্রব অনেক বেড়েছে। বাসিন্দা মো. বিল্লাল বলেন, ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, কিছুদিন আগে একজন নারীও মারা গেছেন। রাতে মশার কারণে ভয় নিয়ে থাকতে হয়। ওষুধ ছিটালেও মশা কমে না।

একই এলাকার বাসিন্দা সুফিয়া খাতুন বলেন, মশার ভয়ে রাতে ঘুমানো যায় না। দিনে কিছুটা কম থাকলেও রাতে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ দেওয়া হলেও তাতে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। তিনি বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে স্পেশাল জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি হওয়ায় মানুষের চলাচলও বেশি। মশার প্রজননের ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে প্রতিদিন দুই দফায় মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফগিংয়ের পাশাপাশি স্প্রেও করা হচ্ছে। এছাড়া বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণ করে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।

বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২০ শয্যার ওয়ার্ডে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেককে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। যদিও বছরজুড়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হতো, রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় গত ২ জুলাই পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়। বুধবার সকাল পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিলেন ৩৯ জন রোগী।

দায়িত্বরত নার্সদের তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২৪২ জন রোগী। এর মধ্যে ১০৩ জন ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা এবং তাদের প্রায় ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার। সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছেন নওমহল, আকুয়া মাদরাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে।

আকুয়া মাদরাসা কোয়ার্টার এলাকায় আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াতে গিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন স্কুলশিক্ষক আবদুল আউয়াল। তিনি জানান, গত বুধবার সেখানে মশার কামড় খাওয়ার পর রাতে জ্বর আসে। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরদিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয় এবং তার প্লাটিলেট নেমে যায় ৬৮ হাজারে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রাকিব হোসেন (২০) কাজের সন্ধানে গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকায় গিয়ে সাত দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হন। চিকিৎসায় জ্বর না কমায় তিন দিন আগে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাকে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। রাকিব বলেন, রাতে বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় মশা কামড়েছিল বলে মনে হয়। পরদিন দুপুর থেকেই জ্বর শুরু হয়। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাছিমপুর গ্রামের তাসলিমা আক্তারের (২০) সঙ্গে হাসপাতালে থাকা তার ভাবি নাসরিন আক্তার জানান, প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। পরে চিকিৎসক টাইফয়েড সন্দেহে সাত দিন ইনজেকশন দিলেও জ্বর কমেনি। এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেলে আনার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তিনি বলেন, এখনো তেমন উন্নতি হয়নি।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলায় ২২ জুলাই পর্যন্ত আরও ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৫ জন। একই সময়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৩৬ জন রোগী, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে উপজেলা ভিত্তিক আক্রান্তের পৃথক পরিসংখ্যান সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নতুন যোগ দেওয়া চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশিরভাগই সিটি করপোরেশন এলাকার হলেও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগী আসায় মোট সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান বলেন, এই মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। জ্বর ও শরীরে র‍্যাশ নিয়ে বেশিরভাগ রোগী হাসপাতালে আসছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।

সাখাওয়াত সুমন/এসএইচএ