গাইবান্ধায় চার দিনের অতিবৃষ্টিতে ও উজানের ঢলে ১২৪.৪ হেক্টর বা প্রায় ১০০০ বিঘা জমির ক্ষেত পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। এছাড়া আক্রান্ত হয়েছে ৩৭৯.৫ বা ২ হাজার ৯০০ বিঘা জমির ক্ষেত। গেল ১২ জুলাই থেকে ১৫ জুলাইয়ের অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার সাত উপজেলাই এই ক্ষতি হয়।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে আমন বীজতলা, আউশ ধান, মরিচ, আদা, হলুদ, শাক সবজি ও পাট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ও আমনের বীজতলা। পুরোপুরি নষ্ট হওয়া আমন বীজতলার জমির পরিমাণ ৩৩.৫ হেক্টর বা ২৫২ বিঘা এবং আউশের সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেতের পরিমাণ ৬২ হেক্টর বা ৪৬৫ বিঘা। এছাড়া পাট ২৪৫ হেক্টর, মরিচ ১.২৫ হেক্টর, আদা ও হলুদ ০.১ হেক্টর করে এবং শাক সবজি ২৫ হেক্টর। অন্যদিকে, পানিতে আক্রান্ত ফসলের মধ্যে সব চেয়ে বেশি আউশ ১৪১ হেক্টর বা ১ হাজার ৫৭৬ বিঘা এবং আমনের বীজতলা ১৩২ হেক্টর।
কৃষি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে আমনের বীজতলার বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে। একই কারণে গত বছরে সংকট এবং কয়েক গুণ দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল আমনের চারার। কোনো কোনো এলাকার কৃষক ২ থেকে ৩ দফা আমন রোপণ করেও ফসল ঘরে তুলতে পারেননি, পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এবছরও আমনের চারার প্রবল সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
তবে, কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন যেহেতু সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমনের চারা রোপনের সময়। সেহেতু জলাবদ্ধতার পানি দ্রুত নেমে গেলে এখনও নতুন করে বীজ বপণের সুযোগ থাকতে পারে।
সরেজমিনে, সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের পশ্চিম রাধাকৃষ্ণপর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জাল দিয়ে ঘেরা বীজতলার জমি। কোনো কোনো জমিতে আংশিক চোখে পড়লেও অনেক জমিতে নিচিহ্ন হয়েছে চারা। কেবল ফাঁকা পড়ে আছে পানিবদ্ধ জমি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে আশপাশের অনেক এলাকায় একই অবস্থা।
অন্যদিকে জেলার অন্যান্য উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীজতলার পাশাপাশি আউশের বেশি ক্ষতি হয়েছে সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। এছাড়া সুন্দরগঞ্জের তিস্তার অববাহিকার এলাকায় উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধির ফলে ক্ষতি হয়েছে বীজতলা ও ফসলি ক্ষেত।
বোয়ালীর স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, প্রতি বছর যেসব জমিতে আমনের চারা উৎপাদন করা হয় এবছর সেখানে হাটু পরিমাণ পানি জমে আছে। এই এলাকায় নালা বা খাল না থাকার কারণে জলাবদ্ধতায় প্রতি বছর এরকম বীজতলা এবং ফসল নষ্ট চক্রের কবলে পড়তে হয়।
এই এলাকার স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত গৃহস্থ কৃষক জফের উদ্দিন বলেন, বৃষ্টির কারণে আমার এক জমিতেই এক মণ ধানের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। বীজ, হাল, সার, কামলা সহ ১০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়েছে। জমি রোপণ করব কিভাবে জানি না।
একই গ্রামের বর্গাচাষি শাহারুল মিয়া বলেন, দুই বিঘা জমির জন্য ১২ কেজি বীজ ফেলানো হয়েছিল। চারা গজানোর কয়েকদিনের মধ্যেই অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, আমন মওসুমে চারা কিনে দুই দফায় আমন রোপণেও এক কেজি ধানও পাইনি, খড়ও পাইনি। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের সরকারিভাবে চারা রোপণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা করা প্রয়োজন।
আরেক কৃষক মতিন মিয়া বলেন, আমাদের এখানে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার নালার অভাবে আমরা একেক বছর একেক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। কোনো বছর বীজতলা, কখনো কখনো ইরির বীজতলাও নষ্ট হয়। আর প্রতিবছর আমন মওসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা।
এই ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমনের বীজতলা বা বীজ বপণের সময় আছে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাও অনেক। এখনো সিংহভাগ জমির পানি নেমে যায়নি, তারওপর থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বীজতলা ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতির হিসেব জেলায় পাঠাচ্ছি। বীজতলা নষ্ট হয়ে এই এলাকার কৃষক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বলেন, অতি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধির কারণে জেলায় ৩৩.৫ হেক্টর বীজতলা সহ ১২৪.৪ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। এছাড়া এখনো পানিতে আক্রান্ত রয়েছে বীজতলা সহ ৩৭৯.৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল। দ্রুত পানি নিস্কাশন হলে হয়তো আক্রান্ত ফসলের অনেকটাই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারে।
আমরা মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছি। পুরোপুরি ক্ষতির বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করছি।
মাসুম বিল্লাহ/আরকে
