বিজ্ঞাপন

ইউএনওর বিরুদ্ধে সরকারি ভবন ভেঙে মালামাল বিক্রির অভিযোগ

ইউএনওর বিরুদ্ধে সরকারি ভবন ভেঙে মালামাল বিক্রির অভিযোগ

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা, দরপত্র আহ্বান, পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি, সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা ছাড়াই পায়রা নামের এই ডুপ্লেক্স ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙার পর সেই ভবনের পরিত্যক্ত সব মালামাল বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারের বিরুদ্ধে।

দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বাসভবন পায়রা ভবনটি ৯০ এর দশকে নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় সেই ভবনটির মেরামত ও কারুকাজ করা হয়েছিল। দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী সুমন সর্বশেষ এই ভবনটিতে বাস করতেন। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ছাত্রজনতা সেই ভবনটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। দরজা-জানালাসহ সকল আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হলেও পড়ে থাকে শুধু দৃষ্টিনন্দন পায়রা ভবনটির অবকাঠামো।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো সরকারি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি কনডেমনেশন কমিটি গঠন করার অনুরোধ করে আবেদনপত্র জমা দেবেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক একটি কনডেমনেশন কমিটি করেন। কনডেমনেশন কমিটির সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রেক্ষিতে নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নিলামপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিলে তবেই ভাঙবার অনুমতি মিলবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা ইসলাম কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সারের কাছে পায়রা ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য একটি আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক নিজেকে সভাপতি করে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি কনডেমনেশন কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীতে গঠিত ওই কমিটি সরেজমিন ভবনটি পরিদর্শন করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলীকে আদেশ দেন। ওই আদেশের চিঠি পর্যন্তই কার্যক্রম স্থগিত থাকে।

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মতিনের বিতর্কিত এক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালের জেরে চট্টগ্রামে বদলি করা হলে ফাইলটি সেখানেই আটকে যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ভবনটির মালামালের দাম এবং ভাঙার খরচসহ প্রাক্কলিত একটি ব্যয় নির্ধারণ করে উপজেলা প্রকৌশল অফিস। এর মধ্যে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫০৪ টাকা জিনিসপত্রের দাম উল্লেখ করা হয়। ভবনটি ভাঙার খরচ ধরা হয় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪টাকা। সে অনুযায়ী অবশিষ্ট ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪০০ টাকা সর্বনিম্ন দর উল্লেখ করে দরপত্র আহ্বান করার কথা। দরপত্র অনুযায়ী নিলামের সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও ছলচাতুরী করে ভবনটি ভেঙে মালামাল বিক্রি করে দেওয়ায় এসব অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা ইসলাম ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট বদলি হয়ে দাউদকান্দি থেকে চলে যান। তার বিদায়ের তিন দিন পর ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরীন আক্তার দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেন।

নাছরীন আক্তার দাউদকান্দিতে যোগদান করে বিভিন্ন বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পায়রা ভবনটির ভাঙার প্রতি নজর দেন। ইউএনও নাছরীন আক্তার ডিসেম্বরে বদলি হওয়া কুমিল্লা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মতিনের বদলির সুযোগ নেন। ভবনটি ভাঙার দরপত্র আহ্বান, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং সরকারি কোষাগারে কোনো অর্থ জমা ব্যাতিরেকেই গত ডিসেম্বরে লোকজন দিয়ে ভবনটি ভাঙার কাজে হাত দেন। ভবনটি ভেঙে দরজা, জানালা, পরিত্যক্ত ইট, রডসহ মালামাল সব বিক্রি করে দিয়ে সেসব অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ইউএনও নাছরীন আক্তারের বিরুদ্ধে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হওয়ার পর চলতি জুলাই মাসের ১৪ তারিখ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে ভেঙে ফেলা পায়রা ভবনটি পরিদর্শন করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শনের পর গত ১৭ জুলাই কনডেমনেশন কমিটির মিটিং আহ্বান করে একটি চিঠি দেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিন। তার দুদিন পর ১৯ জুলাই জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে কনডেমনেশন কমিটির মিটিং হয়। এতে সরকারি বিধিকে উপেক্ষা করে পায়রা ভবনটি ভাঙার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে বলে কনডেমনেশন কমিটির গোপন একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

নাম গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৬-৭ মাস আগে দেখেছিলাম পায়রা ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। দিনে ভাঙার কাজ করে রাতে ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে যায়। ১০-১২ দিন এই চিত্র দেখেছি। তবে এসব মালামাল কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারা ভাঙার কাজ করেছে এসব বিষয়ে জানতে পারিনি।

নাম গোপন রাখার শর্তে দাউদকান্দি উপজেলায় কর্মরত এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগের ইউএনও নাঈমা ইসলামের বদলির পর ফাইল দেখে নতুন যোগ দেওয়া ইউএনও নাছরীন আক্তার চালাকি করে ভবনটি ভেঙে সেটির মালামাল সব বিক্রি করে দিয়েছেন গোপনে। নিয়মানুযায়ী যেসব ক্রাইটেরিয়া পালন করে ভবনটি ভাঙার কথা ছিল, সেসবের তোয়াক্কাই করা হয়নি। মালামাল বিক্রির পুরো অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেছেন।

দাউদকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পায়রা ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণার লক্ষ্যে একটি সামগ্রিক প্রাক্কলন ব্যয়ের হিসাব দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আমাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হলে আমরা প্রাক্কলন ব্যয় তৈরি করে সেটি জমা দিয়েছি। উপজেলা পরিষদের মাসিক সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। পরে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।

এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারের সঙ্গে দুদিন ধরে চেষ্টা করে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বারবার বিষয়টি এড়িয়ে যান। বুধবার (২২ জুলাই) সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার সরকারি নম্বরে থাকা হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে একটি বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হয়। তিনি কোনো সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দাউদকান্দি থেকে বদলি হয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসেবে কর্মরত আছেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা ইসলাম। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি ওই ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য আবেদন করে এসেছিলাম। গত বছরের আগস্টে আমার বদলি হয়। আমি থাকা অবস্থায় কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। পরে কী হয়েছে সেটা জানি না।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকারের সহকারী কমিশনার আশফিয়া ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমি একটি চিঠি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দিয়েছি। পরে কী হয়েছে বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি দীর্ঘদিন ট্রেনিংয়ে কুমিল্লার বাইরে ছিলাম।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার উপপরিচালক মেহেদী মাহমুদ আকন্দ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ বিষয়টি শুনে খুবই আশ্চর্য হলাম। এটা যদি হয়ে থাকে তবে মারাত্মক অন্যায় হয়েছে। আমি ডিসি স্যারকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করব।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত জুনের মাঝামাঝি আমি বিষয়টি জেনেছি। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি মিটিং আহ্বান করে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়টিতে সিরিয়াস পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আকতার ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি সেদিন মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এটার বিষয়ে আমি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিককে দায়িত্ব দিয়েছি। আপনি একটু উনার সঙ্গে কথা বলেন।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আইনের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে সরকারের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরিফ আজগর/আরএআর