ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের ঘটনায় থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলেও বিভিন্ন অজুহাতে মামলা না নিয়ে আদালতে যেতে বলা হয়। পরে ন্যায়বিচারের আশায় তারা ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের জওগাঁও গ্রামের মিশর-প্রবাসী মিলন ইসলামের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে গত ১ জুলাই রাতে বাড়ির পাশ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পাশের একটি স্থানে কিশোরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ঘটনার আগে দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকার তিন কিশোর ওই স্কুলছাত্রীকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করত। প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া, অশালীন মন্তব্য ও বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি অভিযুক্তদের পরিবারকে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার হয়নি। ঘটনার রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাড়ির পাশের টয়লেটে যাওয়ার সময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা তিনজন কিশোর তার মুখ চেপে ধরে এবং নেশাজাতীয় কিছু শুঁকিয়ে অচেতন করে নিয়ে যায়। পরে তাকে টয়লেটের পেছনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। জ্ঞান ফেরার পর কিশোরী পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেয়।
এ ঘটনায় কিশোরীর মা রাণী আক্তার বাদী হয়ে একই গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে পাভেল (১৬), সাহাদতের ছেলে বাদল ওরফে উপাসু (১৭) এবং শাহজাহানের ছেলে রিমন আলীর (১৫) বিরুদ্ধে রাণীশংকৈল থানায় লিখিত এজাহার দেন। প্রথমে মামলা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে ওসি বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা নন্দুয়ার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জমিরুল ইসলামের প্রভাবের কারণেই থানায় মামলা নেওয়ানি পুলিশ। কেননা অভিযুক্তরা ওই নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় পুলিশ ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখিয়েছে। তবে জমিরুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কিশোরীর মা রাণী আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছিল। ঘটনার পর থানায় গেলে ওসি প্রথমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে কয়েক দিন ঘুরিয়ে মামলা নেননি। উল্টো স্থানীয়ভাবে মীমাংসার কথা বলেন। বাধ্য হয়ে আমরা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। অভিযোগ দেওয়ার পর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত পাভেল, বাদল ওরফে উপাসু এবং রিমন আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নন্দুয়ার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জমিরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। আমার নাম জড়িয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি কাউকে মামলা না নেওয়ার জন্য থানায় কোনো ধরনের প্রভাব বা সুপারিশ করিনি।
তবে রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি আমার কাছে মিথ্যা মনে হয়েছে। তাই মামলা গ্রহণ করা হয়নি।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
