এক সময় পদ্মা, গড়াই, চন্দনা, চন্দ্রা ও হড়াই নদীকে ঘিরেই আবর্তিত হতো রাজবাড়ীর অর্থনীতি ও জনজীবন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জেলার নদীগুলো এখন অবৈধ দখলের শিকার। নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দখলদাররা। নদীর জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন, ক্লিনিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার বিভিন্ন নদীতে অন্তত ৪৮৮ জন দখলদারের তালিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দখল অব্যাহত থাকলেও কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে নদীর বুক।
সম্প্রতি চন্দনা নদীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়ের সামনেই নদীর প্রায় ২ দশমিক ৮৬ একর জমি দখল করে দুইতলা ভবন নির্মাণ করছেন দলিল উদ্দীন শেখ। শুধু তিনি নন, চন্দনা নদীর তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী দখলের কারণে অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ভরা বর্ষাতেও খালগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। ফলে নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের কয়েক কোটি টাকার খনন কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত সুফল দিচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, জেলায় অবৈধভাবে নদী দখলের বিষয়টি আমাদের নজড়ে এসেছে। কোথাও অবৈধভাবে নদী দখলের খবর পেলে আমরা আমাদের অফিসার পাঠিয়ে দখলদারদের সতর্ক করছি। যারা অবৈধভাবে নদী দখল করছে তারা কারো না কারো আর্শীবাদপুষ্ট হয়েও এই কাজগুলো করছে, আমরা সেটিও মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করেছি। প্রতিনিয়তই আমরা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে রাজস্ব মিটিংয়ে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করছি।
তিনি আরও বলেন, নদীতীর থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।যেহেতু এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, বিষয়গুলো এক দিনে সমাধান হয় না। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব থাকে উচ্ছেদের বিষয়ে। অচীরেই আমরা একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেব। একবারে সবগুলো যেহেতু উচ্ছেদ করা সম্ভব না, তাই আমরা পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করবো।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতি শঙ্কর ঝন্টু বলেন, নদী দখলের পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অবিলম্বে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দখলের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে রাজবাড়ীর নদীগুলো আবারও ফিরে পাক তাদের নিজস্ব স্রোতধারা ও প্রাণচাঞ্চল্য। তবেই টিকে থাকবে নদীনির্ভর পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি।
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এএমকে
