যে ভবনের কক্ষগুলো একসময় নাটকের সংলাপ, গানের সুর, আবৃত্তি আর নৃত্যের ছন্দে মুখর থাকত, সেখানে এখন নীরবতাই যেন বেশি চোখে পড়ে। ভবনের দেওয়ালজুড়ে শ্যাওলা, জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে পলেস্তারা। পুরোনো রং মুছে গেছে অনেক আগেই। জেলার সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ঠাকুরগাঁও জেলা শিল্পকলা একাডেমি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে জৌলুশ হারাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিল্পকলা একাডেমির ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেওয়ালে শ্যাওলা ও আগাছা জন্মেছে। চারপাশের পরিবেশও অনেকটা অযত্নে পড়ে থাকা ভবনের মতো। সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় ভবনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে।
ভবনের জীর্ণতার পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের বসার জন্য নেই উপযুক্ত অপেক্ষাকক্ষ। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, উন্নত সাউন্ড সিস্টেম ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবও রয়েছে।
জেলার সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষ্য, একসময় ঠাকুরগাঁও নাটক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি চর্চায় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সক্রিয় জেলা ছিল। এই শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল অনেক শিল্পীর পথচলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

নাট্য অভিনেতা আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, একসময় এই শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চ ছিল জেলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই নাটকের মহড়া, কর্মশালা ও বিভিন্ন আয়োজন ঘিরে শিল্পীদের প্রাণচাঞ্চল্য থাকত। কিন্তু এখন সেই পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ভবনের জীর্ণ অবস্থা, আধুনিক মঞ্চসুবিধার অভাব এবং পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। সংস্কৃতি চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শিল্পকলা একাডেমিকে দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা জরুরি।
গিটার বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা বলেন, আমরা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে প্রশিক্ষণ নিতে চাই। কিন্তু এখানে সেই সুযোগ নেই। অনেক কিছু ইউটিউব দেখে শিখতে হয়। শিল্পকলা একাডেমিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলে আমরা আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতাম।
এক অভিভাবক বলেন, আমাদের বসার মতো ভালো জায়গা নেই। বিশুদ্ধ খাবার পানিরও ব্যবস্থা নেই। শিশুদের নিয়ে অনেক কষ্ট হয়। এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অন্তত মৌলিক সুবিধাগুলো থাকা উচিত।
সংস্কৃতিপ্রেমী জাফর ইকবাল বলেন, সংস্কৃতি একটি সমাজকে মানবিক করে তোলে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে শিশুরা সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাবে। এর প্রভাব পুরো সমাজের ওপরই পড়বে। তাই শিল্পকলা একাডেমির উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
সংস্কৃতিকর্মী মাহাবুব আলম বলেন, সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির মূল্যবোধ ও পরিচয়ের ভিত্তি। একটি শিল্পকলা একাডেমির অবহেলা মানে কেবল একটি ভবনের জীর্ণতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকে ধীরে ধীরে নিভিয়ে দেওয়ার শামিল।
জেলা কালচারাল অফিসার মো. আলমগীর কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকলা একাডেমির বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। ভবনের সংস্কার, আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেমসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ করা হবে। এতে জেলার শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা আরও ভালো পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
