বিজ্ঞাপন

বইয়ের ব্যাগের বদলে কাঁধে কফির ফ্লাস্ক, জীবনযুদ্ধে হার না মানা ফাহিম

বইয়ের ব্যাগের বদলে কাঁধে কফির ফ্লাস্ক, জীবনযুদ্ধে হার না মানা ফাহিম

যে বয়সে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ নয়, ঝুলছে কফির ফ্লাস্ক। প্রতিদিন মাগুরার মহম্মদপুর বাজারের অলিগলি ঘুরে কফি বিক্রি করেই চলছে তার পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ।

সে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার যশপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. ফাহিম। বাবা মো. সাখাওয়াত মোল্যা একজন দিনমজুর এবং মা পারুল বেগম গৃহিণী। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, বড় ভাই জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যে ছোট ছেলে ফাহিমকেই এখন বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে হচ্ছে।

ফাহিম উপজেলার মৌশা মোহাম্মাদীয়া (স.) দাখিল মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে সংসারের দায় কাঁধে নেওয়ায় নিয়মিত ক্লাস করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। সপ্তাহে শুধু বৃহস্পতিবার মাদরাসায় যায়, আর বাকি দিনগুলো কেটে যায় মহম্মদপুর সদর বাজারে কফি বিক্রি করে। তবে পরীক্ষার সময় ঠিকই অংশ নেয় সে।

ফাহিম প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে একটি বড় ফ্লাক্সে প্রায় ১০০ কাপ কফি তৈরির উপকরণ, গরম পানি, চিনি, কফি ও একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ নিয়ে বিশেষ ধরনের একটি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত বাজারের বিভিন্ন দোকান, অফিস ও পথচারীদের কাছে কফি বিক্রি করে সে। প্রতি কাপ কফির দাম ১০ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ১০০ কাপ কফি বিক্রি করে সব খরচ বাদে তার হাতে থাকে প্রায় ৫০০ টাকা। এই অর্থেই কোনোমতে চলে তাদের চার সদস্যের সংসার।

উপজেলার যশপুর গ্রামে তাদের বসবাস দুটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে। একটি ঘরের ছাউনি ভাঙাচোরা, অন্যটির দুই পাশে টিন থাকলেও বাকি দুই পাশে পাটকাঠির বেড়া। মাটির কাঁচা ডোয়ার এই ছোট্ট ঘরেই বাবা-মাকে নিয়ে বসবাস ফাহিমের।

ফাহিম বলে, ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট দেখেছি। সংসারের অভাবের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারি না। কফি বিক্রি না করলে সংসার চলে না। দাখিল পর্যন্ত কোনোভাবে পড়তে চাই। কিন্তু এরপর হয়তো আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব না। নিজের খরচ আর সংসারের দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ফাহিমের বাবা সাখাওয়াত মোল্যা বলেন, দিনমজুরি করে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসারই চলে না। ছেলেটা নিজের ইচ্ছায় কফি বিক্রি শুরু করেছে। ওর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা। কিন্তু অভাবের কাছে আমরা অসহায়।

মা পারুল বেগমের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, সব মা-ই চায় সন্তান লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হোক। কিন্তু অভাবের কারণে আমার ছেলেকে এই বয়সেই রাস্তায় নেমে কাজ করতে হচ্ছে। কেউ যদি ওর পড়াশোনার দায়িত্ব নিতো, তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, ছোট বয়সেই ফাহিমের পরিশ্রম ও ভদ্র আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে। অনেকেই তার কাছ থেকে কফি কিনে উৎসাহ দেন। তাদের আশা, সমাজের বিত্তবান মানুষ কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে ফাহিম আবার নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরতে পারবে।

মৌশা মোহাম্মাদীয়া (স.) দাখিল মাদরাসার শিক্ষকরা বলেন, ফাহিম মেধাবী ও ভদ্র ছাত্র। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। আমরা চাই, সে যেন লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে তার ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

সচেতন মহলের দাবি, ফাহিমের মতো মেধাবী ও সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের পাশে সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এগিয়ে আসা জরুরি। তাদের মতে, দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা যেন বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ফাহিমের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী আবারও নিয়মিত শিক্ষাজীবনে ফিরতে পারবে এবং দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে।

বইয়ের ব্যাগের পরিবর্তে কাঁধে কফির ফ্লাস্ক ঝুলিয়ে প্রতিদিন জীবনসংগ্রামে নামা ফাহিম আজ শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি দারিদ্র্যের কাছে হারতে বসা অসংখ্য শিশুর প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতায় তার স্বপ্নের পথ আবারও আলোকিত হয়, নাকি অভাবের কাছে থেমে যায় একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাজীবন।

তাছিন জামান/এএমকে