শিল্প, তাঁত ও বাণিজ্যের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা নরসিংদী। লটকন, কলা ও নানা সুস্বাদু ফলের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল হিসেবে রয়েছে আলাদা পরিচিতি। কিন্তু জেলার অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নরসিংদী–মদনপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের চিত্র যেন সেই গৌরবের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
সড়কের দুই পাশে দিনের পর দিন জমছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ, আবার কোথাও খানাখন্দে ভরা সড়ক পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদ। বৃষ্টির পানি, পচা আবর্জনা ও তরল বর্জ্যে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধময় জলাবদ্ধতা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী, যাত্রী, চালক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
নরসিংদী পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে সড়কের আশপাশে ফেলা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এসব ময়লার স্তূপ এতটাই বড় হয়েছে যে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় সড়কের দুই পাশে ছোট ছোট পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। ময়লার স্তূপে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশু ও কুকুর। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকিও।
বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, পথচারী ও সড়কের পাশে বসবাসকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক সময় দুর্গন্ধ এড়াতে পথচারীদের নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে দেখা যায়। শুধু বর্জ্য নয়, সড়কটির বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। কোথাও উঠে গেছে পিচ, কোথাও আবার জমে আছে পানি ও কাঁদা। বৃষ্টির সময় ময়লা ও কালো তরল বর্জ্য মিশে এসব গর্ত আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানির নিচে থাকা গর্ত বুঝতে না পেরে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন মোটরসাইকেল, রিকশা ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরা।

চৌয়ালা এলাকার টেক্সটাইল মিল মালিক শাহজাহান সরকার বলেন, সড়কে গাড়ি উল্টে অনেক সময় কাপড়ের বেল ময়লা ও কালো পানিতে পড়ে যায়। ওই পানি কাপড়ে লাগলে আলকাতরার মতো দাগ পড়ে। পরে এসব কাপড় আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। এতে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ফয়সাল বলেন, সড়কের বেহাল দশা ও যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ যানজটে পণ্য পরিবহনে সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় যাত্রী সজুব মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির এমন অবস্থা থাকলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। একটি শিল্পসমৃদ্ধ জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ এভাবে পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জামিল মিয়া জানান, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করি, খুব কষ্ট হচ্ছে। নাক মুখ চেপে চলাচল করতে হয়, মাঝে মধ্যে দেখি এই গন্ধে কেউ কেউ অজ্ঞানও হয়ে যায়। খুব বাজে অবস্থা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেগুলো পানিতে ডুবে যায়। এতে যানবাহনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনাও ঘটছে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি আর বর্ষায় কাঁদা-পানিতে দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে সড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ, অন্যদিকে ভাঙাচোরা রাস্তা দুই সংকটে আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক। শিল্পাঞ্চল মাধবদীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় সড়কটির ওপর চাপও অনেক বেশি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সড়কের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ চলছে। বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা শুধু শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি।
তিনি জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে একটি প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালের ২৪ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কটি দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হায়দার বলেন, সড়কের দুই পাশে ময়লা ফেলার কারণে পানি জমে রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। সড়কটি দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয় দ্রুত কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের স্থায়ী সংস্কারের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হবে নরসিংদী–মদনপুর আঞ্চলিক সড়কের স্বাভাবিক পরিবেশ। কারণ একটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক শুধু যাতায়াতের পথ নয়; এটি সেই জেলার উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামগ্রিক ভাবমূর্তিরও প্রতিচ্ছবি।
আমিনুর রহমান সাদী/এসএইচএ
