বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুমিল্লায় ৪২ মামলার চার্জশিট দেওয়া হলো দুটিতে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুমিল্লায় ৪২ মামলার চার্জশিট দেওয়া হলো দুটিতে

২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা, হামলা ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় ৪২টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার দীর্ঘ সময় পার হলেও মাত্র দুটি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে পেরেছে পুলিশ। বাকি ৪০টি মামলার তদন্ত চলছে। দীর্ঘদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এসব মামলার মধ্যে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ১৮টি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৬টি, দাউদকান্দি মডেল থানায় ৪টি, দেবিদ্বার থানায় ৪টি, বাঙ্গরা বাজার থানায় ২টি এবং বরুড়া, নাঙ্গলকোট ও চৌদ্দগ্রাম মডেল থানা, চান্দিনা, মনোহরগঞ্জ, বুড়িচং থানায় ১টি করে মামলা রয়েছে।

দায়ের করা এসব মামলার মধ্যে ১২টি হত্যা এবং ৩০টি হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র-বিস্ফোরক দ্রব্য ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা হয়েছে। হত্যা মামলার মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ২টি, দাউদকান্দি মডেল থানায় ৩টি, দেবিদ্বার থানায় ৩টি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ১টি, বরুড়া থানায় ১টি, নাঙ্গলকোট থানায় ১টি এবং চৌদ্দগ্রাম থানায় ১টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

এসব মামলার মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেলে বিজয় মিছিলে কুমিল্লা নগরীতে গুলিতে নিহত হন বিএনপিপন্থি আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ। এ ঘটনায় আইনজীবী আবুল কালামের সহকারী মোস্তফা জামান জসীম বাদি হয়ে কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহারকে প্রধান এবং ২৫-৩০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলাটি তদন্তের পর গত বছরের আগস্টে সাবেক সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহারসহ ৩৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। এছাড়াও বরুড়া থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। কোতোয়ালি থানার বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোতোয়ালি মডেল থানায় দুটি হত্যা মামলার মধ্যে আইনজীবী আবুল কালাম আজাদের মামলাটির চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। রাফসান নামের হোটেল কর্মচারী হত্যার মামলায় পরিবারের বাধায় মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে উত্তোলন করা যায়নি। প্রতিটি মামলায় অনেক আসামি। তাই ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণসহ অন্যান্য তথ্য বের করতে হচ্ছে। এ কারণে অভিযোগপত্র দিতে বিলম্ব হচ্ছে।  

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দাউদকান্দিতে স্কুলছাত্র রিফাত হোসেন (১৭), দিন মজুর বাবু মিয়া (২৩) ও অটোরিকশাচালক সুলতান আহমেদ নামের তিনজন শহীদ হন। তিনটি হত্যার মামলা এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। এই থানার তিনটি হত্যা মামলার মধ্যে একটি মামলারও চার্জশিট জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে দাউদকান্দি মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। আশা করছি দ্রুতই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

আন্দোলন চলাকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণে মাছুম মিয়া হত্যার ঘটনায় জেলায় প্রথম হত্যা মামলা হয়। এ মামলটিরও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাসুম হত্যা মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে শিগগিরই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।

দেবিদ্বারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আব্দুর রাজ্জাক রুবেল ও অটোরিকশাচালক সাব্বির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। দুটি হত্যার ঘটনায় তিনটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার পর তদন্তের স্বার্থে সাব্বিরের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বারবার আবেদন করেও পরিবারের বাধায় মরদেহ তুলতে পারেনি পুলিশ। ফলে ময়নাতদন্ত জটিলতায় মামলার তদন্ত নিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।

দেবিদ্বার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)  মনিরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরিবার রাজি না হওয়ায় সাব্বিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে পারিনি। দুটি হত্যায় তিনটি মামলা হয়েছে। আসামি অনেক। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

এদিকে তদন্ত কাজে ধীরগতি ও চার্জশিট জমা না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সদর দক্ষিণে হত্যার শিকার শহীদ মাসুম মিয়ার বাবা শাহীন মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই জাতিকে স্বৈরাচার মুক্ত করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে আমার ছেলে। এতদিন পার হয়ে গেল আমার ছেলের হত্যার বিচার হয়নি। পুলিশ কয়েকবার আমার সাক্ষ্য নিয়েছে। আমার কথা একটাই ছেলে হত্যার সঠিক বিচার চাই।

দেবিদ্বারে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক রুবেলের স্ত্রী হ্যাপী আক্তার বলেন, স্বামী হত্যার মামলা কতদূর এগিয়েছে জানি না। প্রথম দিকে সবাই খোঁজখবর নিলেও এখন আর কেউ খবর নিচ্ছে না। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।

অপরদিকে অধিকাংশ মামলায় ঢালাও আসামি করায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে। নাম গোপন রাখার শর্তে এক তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলার বাদি সব আসামিকে চেনেন না। একই সময়ে একই আসামিকে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাস্থলে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। তাই যথাযথ সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক সাক্ষী বেছে বেছে ঘটনার সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করে অভিযোগপত্র জমা দিতে সময় লাগছে।

অপরদিকে এসব মামলায় এডিট করা তালিকা দিয়ে খোদ বিএনপি নেতাকেও গ্রেপ্তার করার ঘটনাও ঘটেছে। যা দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পড়ে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা তার তদন্তে পু্রো মনযোগ দিচ্ছেন। এর ফলেও তদন্ত কাজ দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।

চলতি বছরের আগস্টেই বেশকিছু মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলাগুলো খুবই স্পর্শকাতর। তাই অধিক গুরুত্ব সহকারে মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এই আগস্টেই অনেকগুলো মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

আরিফ আজগর/এসএইচএ