বিজ্ঞাপন

জুলাই শহীদ রাজিবের মায়ের কান্না: ‘সন্তান হারানোর কষ্ট আর কেউ যেন না পায়’

জুলাই শহীদ রাজিবের মায়ের কান্না: ‘সন্তান হারানোর কষ্ট আর কেউ যেন না পায়’

‘এই জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের গালিচার ওপর পা দিয়ে তারা এসেছে। তারা এই সংসদে বসে আছে। তারা যদি কখনও বেঈমানি করে, জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে-সকল বেইমানের কি পরিণতি হয় সেটা তো আমাদের হাদিসেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে। স্বৈরাচারের পতন, ফ্যাসিস্টের পতন যে রকম হয়; যদি কেউ বেঈমানি করে বেইমানিরও পতনও হয়তো বা তাই হবে। আল্লাহ যেন এটা না দেখায়!’

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের জয়কুমর গ্রামের জুলাই যোদ্ধা বীর শহীদ স্কাউটার রাজিব উল করিম সরকার রাব্বীর মা জান্নাতুল ফেরদৌস তার প্রয়াত ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এসব কথা বলেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মেধাবী সন্তান রাজিব লালমনিরহাটে বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে সেখানে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে অবস্থানকালীন ৪ আগস্ট সে ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নেয়। ৫ আগস্ট আন্দোলনে অংশ নিতে লালমনিরহাট জেলার মিশন মোড়ে অবস্থান নেয়।

এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। রাত দেড়টার দিকে তাকে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খানের বাসায় আগুনে পোড়া মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মেধাবী রাজিবকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। কিন্তু অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে। তার এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তারা বাবা-মা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পরছেন তারা।

রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার লালমনিরহাটে অবস্থিত বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক সহকারী (এটিও) হিসেবে কর্মরত। তাদের তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে রাজিব সবার বড়। সে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল। ৭টা পরীক্ষা দিয়েছিল সে। তার মেজো ভাইয়ের নাম জামিউল করিম সরকার এবং ছোট ভাই মেজবাহ উল করিম সরকার।

রাজিবকে নিয়ে আমাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হয় ওর মা জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে। তিনি জুলাই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, জুলাই আন্দোলনে ছেলের অংশগ্রহণ, ছেলের শৈশবের দিনকাল ও ছেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

জুলাই নিয়ে রাজিবের মা জানান, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে ভালো এবং মন্দ আছে। কিছু মানুষের জন্য জুলাই পজিটিভ, কিছু মানুষের জন্য তো নেগেটিভ। যারা নেগেটিভ তারা তো বলবেই জুলাই একটা গাদ্দারি, জুলাই এটা-সেটা-আর সব কথা তো কানে নেওয়াও যাবে না। আমার যেটা চাওয়া- আমাদের যে বর্তমান সরকার প্রধান বা যে দলীয় সরকার তারা যদি কখনও এই জুলাইয়ের সাথে বেইমানি করে বা জুলাইয়ের রক্তে কিন্তু তারা! আমরা যেমন লাল গালিচাকে বলি তারা কিন্তু এই জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের গালিচার উপর পা দিয়ে তারা এসেছে। তারা এই সংসদে বসে আছে। তারা যদি কখনও বেইমানি করে জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে-সকল বেইমানের কি পরিণতি হয় সেটা তো আমাদের হাদিসেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে।

স্বৈরাচারের পতন, ফ্যাসিস্টের পতন যেরকম হয়, যদি কেউ বেইমানি করে বেইমানিরও পতনও হয়তো বা তাই হবে। আল্লাহ যেন এটা না দেখায়! একটা সুন্দর সমাজ, সুষ্ঠু আইন হোক; আইনের প্রয়োগ হোক। পরবর্তীতে কেউ যেন এরকম স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা মানে সেটা যেই হোক না কেন কেউ যেন না হয়। সরকার তো গঠিত হবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবেই। তো এমন যেন দিন কারো না আসে কোন মায়েদের দেখতে না হয়। সেরকমই নীতিমালা হোক আইন হোক দেশে গণতন্ত্রের প্রয়োগটা ভালো হোক। এটা হলে এরকম আর হয়ত বা হবে না।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাজিবের মা জানান, ৫ আগস্ট রাজিব আন্দোলনে যাওয়ার পর রাত প্রায় ১১টার পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায় এবং তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ বিষয়ে রাজিবের মা জানান, আমার ছোট ছেলে বলে মা বিপদে পড়লে একটা দোয়া পড়তে হয়, জায়নামাজ বিছিয়ে এই দোয়া তিনবার পড়লে তাহলে তুমি তাড়াতাড়ি একটা খবর পাওয়া যাবে। আমি এক সেকেন্ড দেরি না করে দোয়াটা পড়তেই আছি পড়তেই আছি। ওই পড়া অবস্থায় আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছি। রাজীবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ পেয়ে থাকলে জানাবেন!

১০টা ৫৬ পর্যন্ত তার মোবাইলে রিং যাচ্ছিল। পরে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অফ হয়ে যায়। সে মিশন মোড়ে ছিল, তারপর ওই বাড়িটার দিকে যায়। রাত দেড়টার দিকে আমার ছোট দেবর ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদছিল! আমি তখনেই কিছু বুঝতে পারলাম। তখন আমার সেন্স চলে গেছে। আমি ওই জায়নামাজে বসে সন্তানের মৃত্যুর খবর পাই। আমি একবার শুধু সন্তানের লাশ দেখেছি। আমার ছেলের দাঁড়ি চুল একটাও পুড়ে যায় নাই। কিচ্ছুই পুড়ে যায় নাই। আল্লাহ তাকে এত হেফাজতে রাখছে। একদম চকচকে সাদা হিরের মত আমার ছেলেটা কালো হয়ে গেছে। ধোঁয়াতে আগুনে কালো হয়ে গেছে।

রাজিবের শৈশবকাল নিয়ে তার মা জানান, আমি যখন মাস্টার্সে ভর্তি হই তখন ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাই। আমি ওর কোন যত্ন করতে পারি নাই। ওর বাবাই ওকে মানুষ করেছে। নিজে স্বার্থপরের মত লেখাপড়া ও ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে ছেলেটাকে অবহেলা করেছি। আমি চাকরি করতে গিয়ে ৯/১০ বছর এই ছেলেকে বাবার কাছে রেখে গেছি। বাবার সাথে একা রান্না-বান্না করে খেত। আমি ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতাম। আমি আসতাম-যেতাম। ছেলে আমার রান্না করতে করতে এক্সপার্ট হয়ে গেছে। মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় কী কী পারে? আমার ছেলেটাকে প্রশ্ন করতে হয় কী পারে না। এমন কিছু নেই যে, পড়ালেখাতে ভালো, স্কাউটিং-এ ভালো ছিল, সর্বোচ্চ পুরস্কার প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেল।

ছেলের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজিবের মা জানান, আমার ছেলেটা একটা মুরগি জবাই করতে দেখলে, রক্ত দেখলে ভীষণ ভয় পেতো। সে ডাক্তারি পড়তে চাইতো না। সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইতো। মেধাবী ছিল ভাবছিলাম ডাক্তারি পড়াব। ওর বন্ধুরা বুয়েটে চান্স পেয়েছে। সেও হয়তো পেতো। শহীদ হওয়ার সাতদিন আগে মা-ছেলের কথা হয়েছিল। সে বলেছিল নিজেদের বাড়ির জন্য সুন্দর একটা ডিজাইন করে দেবে সে।

রাজিবকে নিয়ে ওর ছোট ভাই মেজবাহ উল করিম সরকার বলেন, বড় ভাইয়ার সাথে মাছ চাষ, পাখি পুশতাম। আরও কত কাজ করতাম। প্রকাশ্যে কান্না করতে পারি না। ভিতরে ভিতরে অনেক কান্না করি। ভিতরে ভিতরে অনেক কান্না হয়।

রাজিবকে নিয়ে ওর মেজো ভাই জামিউল করিম সরকার বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বড় ভাইয়া বলল যে আন্দোলনে যাবে। আমরাও যাইতে চাইছিলাম। কিন্তু বড় ভাইয়া বলছে যে তোমরা ছোট মানুষ, তোমাদের যাওয়া লাগবে না। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারি এর আগেও বড় ভাইয়া প্রাইভেটের কথা বলে এক ঘণ্টার জায়গায় দুই ঘণ্টা দেরি করে আসত। পরে শুনি বড় ভাইয়া আন্দোলনে গিয়েছিল। ৪ আগস্ট আমরা বড় ভাইয়ার ফেসবুকে লাইভ দেখতে পাই। বড় ভাইয়াকে সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ছে। আমরা বুঝলাম বড় ভাইয়া আন্দোলনে আছে।

ছেলেকে নিয়ে রাজিবের বাবা বলেন, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ৬১৯ নম্বর গেজেট তার। অথচ স্বাধীন দেশে আবার আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধ করি। সব হারিয়ে গেল আমার। ছেলেটা আমার শুধু ছেলে ছিল না, ও আমার বন্ধু ছিল। ওকে আমি ভুলতেই পারছি না। একসাথে বিছানায় থাকা, গোসল করানো, স্কুলে-প্রাইভেটে নিয়ে যাওয়া আসা সব নিজ হাতে করেছি।

ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে রাজিবের বাবা আরও বলেন, ছেলের হত্যার ঘটনা ও বিচার চেয়ে রাজিবের বাবা বলেন, ওর বন্ধুদের সুমন খানের বাসায় আটকিয়ে রাখা হয়েছে, তখন মিছিল থেকে সে ওখানে চলে যায়। সেখানে অনেক লোকজন বাসা ভাঙচুর করছে। ওই অবস্থায় ওরা বন্ধুদের উদ্ধারে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সবাই নেমে আসতে পারলেও; কে বা কারা সেখানে আগুন লাগিয়ে দিল। তারা ওখানে আটকিয়ে যায় এবং তারা ওখানে শহীদ হন। আমি চাই সুষ্ঠু দন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচার হোক।

রাজিবকে নিয়ে রাজারহাট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই যোদ্ধা আল মিজান জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কুড়িগ্রামে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। আর কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় ১৪ জন আহত হয় এবং একজন জুলাই শহীদ রয়েছে। শহীদ রাজিব লালমনিরহাটে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়। যারা জুলাই যোদ্ধা রয়েছে তারা যেন প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পান এবং তাদের পরিবারকে যেন সহযোগিতা করা হয়। জুলাই আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে অনেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদেরকে রুখে দিয়ে প্রকৃত জুলাই যোদ্ধারা যাতে সহযোগিতা পায় সেটি দেখতে হবে।

মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ