বিজ্ঞাপন

মেঘনায় অবাধে বালু উত্তোলন

ঝুঁকিতে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, চরসোনারপুর তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা

ঝুঁকিতে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, চরসোনারপুর তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা

​নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মেঘনা নদী থেকে ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করছে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙনের চরম হুমকির মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এবং পূর্বাঞ্চল থেকে ২৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান জাতীয় গ্রিডলাইনের টাওয়ার (পিলার)।

​একই সঙ্গে বালুখেকোদের তাণ্ডবে নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন চরসোনারপুর গ্রামের প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে এ তাণ্ডব চললেও তা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো ভূমিকা না থাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। 

​সরেজমিনে দেখা যায়, মেঘনা নদীর কৌশলগত ও সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে দিন-রাত সমানতালে শক্তিশালী একাধিক ড্রেজার চালিয়ে তোলা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু। নদীর তলদেশের গতিপথ ও মাটি পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় ভাঙন পৌঁছে গেছে পাওয়ার স্টেশন ও জাতীয় সঞ্চালন লাইনের পিলারের কাছাকাছি।

নদী সুরক্ষা ​বিশেষজ্ঞদের মতে, পিলারের গোড়া থেকে এভাবে বালু সরে যেতে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়তে পারে। আর এমনটি ঘটলে জাতীয় গ্রিডের আওতাভুক্ত দেশের ২৮টি জেলায় একযোগে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিপর্যয় দেখা দেবে, যা পুরো দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় আঘাত হানবে।

এদিকে নদীগর্ভে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ‘চরসোনারপুর’ গ্রামের ১০ হাজার মানুষ। গ্রামের বসতবাড়ি ও আবাদি জমির একেবারে কাছে ড্রেজিং করায় ভাঙন প্রতিনিয়ত গিলে খাচ্ছে চরের নতুন নতুন এলাকা।

​চরসোনারপুরের প্রবীণ বাসিন্দা ভোজন চন্দ্র দাস বলেন, প্রভাবশালীরা দিন-রাত ড্রেজার দিয়ে বালু তুলতাছে। প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধামকি দেয়। নদী ভাঙতে ভাঙতে আমগোর ঘরের কাছে আইয়া পড়ছে। বালু তোলা বন্ধ না করলে পুরা চরটাই নদীতে তলায়া যাইবো, আমগো ১০ হাজার মানুষ এক রাইতে গৃহহীন হয়া যামু।

চরের আরেক বাসিন্দা রানা সরকার বলেন, আমরা এখন অসহায়। দোয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমাদেরকে নিয়ে সরকার ভাবলে এভাবে দিনেরাতে বালু তুলে আমাদেরকে হুমকির মুখে ফেলতো না। 

দেবলা রানী দাস নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, নদী ভাঙনে আমাদের চর এখন এমনিতেই ছোট হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে এখন বালু তুলে আমাদেরকে নদীতে মারার একটা পথ বের করে দিয়েছে। সরকার কী আমাদের কথা ভাববে?

এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন অবিলম্বে নদীর পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নিলে শুধু একটি চর বিলীন হবে না, বরং পুরো দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে নদী সুরক্ষা বিষয়ক সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে- বিষয়টি আমরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অবগত করেছি। তখন আমরা জানতে পেরেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে কোনো ধরনের বালু উত্তোলনের লিজ দেওয়া হয়নি। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন তাদের ভৈরব অংশে লিজ দিয়েছে। কিশোরগঞ্জ সীমানায় লিজ দিলেও দিনরাত অবৈধভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রভাবশালী মহলের হাত করেই একটি চক্র আমাদের সীমানায় এসে কোটি টাকার ব্যবসা চালাচ্ছে। জাতীয় স্থাপনা হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এসব বন্ধ হোক। 

​অভিযোগ রয়েছে, বালু উত্তোলনের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হাত থাকায় এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আইনি ব্যবস্থা কিংবা নিয়মিত কোনো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে না। এতে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বালু সিন্ডিকেট।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, এই চক্রটি ইজারা পেয়েছে কিশোরগঞ্জ থেকে যেটা কিনা আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ মেঘনা এলাকার ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে, তবুও তারা অন্যায়ভাবে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। 

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে আমি কিশোরগঞ্জ জেলার ডিসির সাথে ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও কথা বলেছি। আমাকে মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা খুব শিগগিরই দুই জেলা মিলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেবো।

জুয়েল রহমান/আরএআর