হত্যাকারী পরশ ও নিহত ফরিদার বাড়ির দূরত্ব ২০ গজের। ফরিদার বাড়ির সামনে প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়। বাড়ি থেকে আসছে আহাজারির শব্দ। বাড়ির ভেতরে ফরিদা পারভীনের শাশুড়ি বাসেয়া বেগমকে (৫৫) জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন লাইলী বেগম নামের এক নারী। পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন ‘আলগা পিরিত’।
এসময় তিনি জানান, ‘লাইলী বেগম হত্যাকারী পরশ সরকারের ফুফু। সান্ত্বনার কান্না দেখাতে এসেছেন।’ স্থানীয় কেউ কেউ বিষয়টি মন্দভাবে নিয়েছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন, তারা দূরসর্ম্পকের হলেও আত্মীয়। এসময় লাইলী বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘ও বুবুরে, ও বুবু। ও বুবুরে এই সর্বনাশ কেনো হলে রে। ও বুবুরে তুমরা কেউ ধরলানারে। সব শেষ হলো রে।’
শনিবার (২৫ জুলাই) সাড়ে ১১টার দিকে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের তেতুলতলা এলাকার নিহত পারভীনের বাড়িতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এলাকায় প্রবেশের সড়কে দাঁড়িয়ে চারটি পুলিশের ভ্যান। রয়েছেন অসংখ্য পুলিশ সদস্য। এই বাগানের আশে পাশে বসে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এনিয়ে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশ সদস্যরা হত্যাকারী পরশ সরকারের বাড়ি ঘিরে রেখেছে। বাড়ির ভিতর থেকে আগুনের ধোঁয়া বাইরে উড়ে আসছে। নিহতের বাড়িতে স্বজনরা আহাজারি করছে।
এরআগে শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির সামনে ছুরিকাঘাতে ফরিদা পারভীন নিহত হন। নিহত ফরিদা পারভীনের স্বামী লালন শেখ হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ। এই ঘটনায় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত পরশের বাড়িতে আগুন দেয়। এছাড়া ঘটনার সময় পরশের সঙ্গে জয় নামের এক ব্যক্তি থাকার কারণে একই ইউনিয়নের টিকটিকিপাড়ার জয়ের বাড়িতেও উত্তেজিত জনতা হামলা চালিয়েছে বলে জয়ের মায়ের অভিযোগ।
খানজাহান আলীর ছেলে মো. নূর বলেন, আগের জমি নিয়ে সমস্যা ছিল। তবে গতকালের হত্যার ঘটনাটা তর্কাতর্কি নিয়ে। আমার দাদির ফুফাতো বোন পরশের ফুফু লাইলী। পরশের দাদার দিক থেকে তারা দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয়।
নিহতের শাশুড়ি বাসেয়া বেগম বলেন, পরশ মারামারি করে বেড়ায়। গতকাল শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে পারিলা রনহাট এলাকায় এক ছেলেকে মারতে গিয়েছিল পরশ। এই কথা প্রতিবেশীদের মধ্যে জানাজানি হয়। বিকেলে ফরিদার বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে পরশকে নিয়ে তিন থেকে চারজন নারী কথা বলাবলি করছিল। এসময় ফরিদাও ছিল।
তিনি বলেন, এদের মধ্যে এক নারী বলে উঠেন ‘যার একটা বেটা (ছেলে) তার মায়ের রো শান্তি নাই, বাবারও শান্তি নাই।’ এসময় পরশের মা যাওয়ার সময় শুনে নেন। এসময় পরশের মা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে বলেন, তোরা আমার বেটাকে নিয়ে গল্প করছিস। আমার বেটা সকালে মারামারি করেছে। এরপর পরশের মা বাড়িতে ফিরে গিয়ে তাকে বলেন। এরপর পরশ দৌড়ে এসে ফরিদাকে ছুরিকাঘাত করেন।
নিহতের স্বজন খানজাহান আলী বলেন, হত্যাকারী পরশ ও নিহত পারভীনের বাড়ির দূরত্ব ২০ গজের। পরশের মায়ের সঙ্গে জমিজায়গা নিয়ে আগের বিরোধ রয়েছে। গতকাল বাড়ির ছাদে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া পরশকে ডাক দেয় তার মা। এতে পরশ কোনো কথা ছাড়ায় দৌড়ে এসে এলোপাথারি আঘাত করতে থাকে ফরিদা বেগমকে। ফরিদা বেগম মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এসময় পরশ ও তার মা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।
তিনি বলেন, পরে ফরিদাকে আঘাতপাপ্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ব্যাটারিচালিত ভ্যান গাড়িতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়। এরপর কাটাখালী বাজারে এসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় তাকে রামেক হাসপাতালে নিয়ে যওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ফরিদার ছেলে ফয়সালও (১৫) মাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন। তিনিও রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরশ সরকার মাদকাসক্ত। তাদের বাড়ির ছাদে প্রতিদিনই মাদকের আসর বসান তিনি। সেখানে বহিরাগতরা এসে মাদকগ্রহণ করেন। এছাড়া পরশ সরকারের বাবা বাবু এলাকায় চিহ্নিত সুদ কারবারি। তার বাবার সুদের টাকার লেনদেন তিনিও করে থাকনে। ফলে অগাধ টাকার মালিক বনে যাওয়ার কারণে এলাকায় বেপরোয়া পরশ সরকার। তার তেতুলতলায় বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের মোবাইল বিক্রির দোকান রয়েছে। ঘটনার দিন সেই দোকানে হামলার ঘটান ঘটে। তারা একে অপরে দূরসম্পর্কের আত্মীয়।
এই ঘটনার পরে টিকটিকিপাড়ার জয়ও পলাতক রয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, জয় নেশাগ্রস্ত। তবে তার মা চম্পা বেগম দাবি করেন, সিগারেট ছাড়া কোনো নেশা সেবন করে না তার ছেলে। তিনি বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত ৮ টার দিকে অনেক মানুষ এসে আমার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। কিন্তু আমি তখনও জানি না। জয় এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। আমার বাড়ি থেকে দুইটা মোবাইল, নগদ এক লাখ টাকা, ও এক ভোরির বেশি স্বর্ণ চুরি রয়েছে। এসময় আমার ছোট ছেলেকে তারা মারধর করেছে। বর্তমানে জয় কোথায় আছে জানি না। তবে তার কাছে একটা মোটরসাইকেল রয়েছে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী নগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মো. গাজিউর রহমান বলেন, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে নিহতের স্বামী লালন শেখ বাদী হয়ে পাঁজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আসামিরা গ্রেপ্তার না থাকলেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
শাহিনুল আশিক/এসএইচএ
