বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারি, তবু ঢুকছে বিকল্প মাদক

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারি, তবু ঢুকছে বিকল্প মাদক

সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ করেই বদলে গেছে মাদক চোরাচালানের চেনা চিত্র। একসময় এই অঞ্চলে ফেনসিডিল ও ইয়াবাকেন্দ্রিক চোরাচালানের আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে নতুন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ ও উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ট্যাবলেট দেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক তৎপরতায় বিভিন্ন চালানের একটি বড় অংশ ধরা পড়লেও, শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট নানা রুট ব্যবহার করে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসব চালান পৌঁছে দিচ্ছে।

জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সীমান্ত ব্যবহার করে ফেন্সিডিল এর পরিবর্তে ‘এস্কাফ’ ও ‘চকোপ্লাস’ নামক সিরাপ এবং ‘ট্যাপেন্টাডল’ ট্যাবলেট নিয়মিত দেশে ঢুকছে। পরে সংঘবদ্ধ চক্রের হাত ধরে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও ধারাবাহিকভাবে তল্লাশি চালানোর ফলে প্রচলিত মাদক পাচার আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরোও জানা গেছে, ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা এসব সিরাপে উচ্চমাত্রার ‘কোডিন ফসফেট’ থাকায় এগুলোর নেশার তীব্রতা নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের সমপর্যায়ের। অন্যদিকে, ট্যাপেন্টাডল মূলত একটি তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ হলেও মাদকসেবীরা এটি ব্যবহার করছে হ্যালুসিনেশন ও তীব্র নেশার বিকল্প হিসেবে। তুলনামূলক সহজলভ্য ও দাম কম হওয়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে এসব মাদকের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।

মাদক কারবারিরা কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত, ইউনিয়নভিত্তিক অরক্ষিত পয়েন্ট এবং দুর্গম গ্রামীণ পথ ব্যবহার করে পাচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রমের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে একাধিকবার ক্যারিয়ার বা ‘হাতবদল’ করা হয়।তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহকরা ধরা পড়লেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে গডফাদারেরা।

বিজিবির সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫৯ বিজিবি উদ্ধার করেছে প্রায়  ১৩ হাজার  ফেনসিডিলের বিকল্প নেশাজাতীয় সিরাপ এবং ৫১ হাজার ৭৭৪ পিস বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট।

অন্যদিকে, ৫৩ বিজিবি জুন ও জুলাই মাসে এক আসামিসহ প্রায় দু হাজার এস্কাফ সিরাপ, ১৮৭ বোতল ফেয়ারডিল সিরাপ এবং ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। একই সময়ে ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন একাধিক অভিযানে এস্কাফ সিরাপের পাশাপাশি রেকর্ড ৩০ হাজার ৭০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। পরে জব্দ করা সব মাদক আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আচরণ ও পড়াশোনায় নীরব অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে অভিভাবকেরা গাঁজা, ফেনসিডিল বা ইয়াবা নিয়ে সতর্ক থাকলেও এখন নেশাজাতীয় সিরাপের আড়ালে অনেক শিক্ষার্থী মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার বুঝতেই পারছে না কখন তাদের সন্তান অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম মেধা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়বে।”

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “মাদক সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বারবার রুট ও মাদকের ধরন পরিবর্তন করছে। শুধু সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদক চোরাচালানের পেছনে থাকা মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি যুবসমাজ ও সীমান্তবর্তী অন্চলের সাধারণ মানুষ কে সচেতনসহ এর কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।”

৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।  এছাড়া দেশের  সার্থে যুবসমাজকে মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।”

১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, “সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং যেকোনো মূল্যে সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে বিজিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

মো: আশিক আলী
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

বিজ্ঞাপন