ফেনীর পরশুরামে গৃহকর্মী হিসেবে যে বাসায় প্রায় চার বছর কাটিয়েছে কিশোরী ফারহানা আক্তার প্রিয়া (১৬)। সেই বাসা থেকেই উদ্ধার হয় তার ঝুলন্ত মরদেহ। মৃত্যুর তিন দিন পরও মেলেনি এর প্রকৃত কারণ। আত্মহত্যা, আত্মহত্যার প্ররোচনা নাকি অন্য কোনো ঘটনা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। এদিকে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, সুরতহাল প্রতিবেদন, প্রতিবেশীদের বক্তব্য ও স্বজনদের অভিযোগ মিলিয়ে একের পর এক নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পরশুরাম উপজেলা গেটসংলগ্ন কাদের টাওয়ারের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গৃহকর্মী প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত প্রিয়া নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট এলাকার মৃত সাইফুল ইসলাম ও ফারজানা আক্তারের মেয়ে।
ওই ফ্ল্যাটে কেতরাঙ্গা মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জাহেদা আক্তার তিমুর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি।
ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন বিকেলে পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের দক্ষিণ তালবাড়িয়ার একটি সামাজিক কবরস্থানে প্রিয়াকে দাফন করা হয়। স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ গ্রহণের মতো কেউ উপস্থিত না থাকায় মায়ের সম্মতিতে গৃহকর্তার পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
প্রিয়ার মৃত্যুর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, মায়ের সঙ্গে অভিমান থেকেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কেউ আবার প্রেমঘটিত সম্পর্কের গুঞ্জনের কথা বলছেন। অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ঘটনার আগের রাতে গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। এমনকি মারধরের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ। তবে এসব দাবির কোনোটিই এখন পর্যন্ত তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
এ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। গতকাল (শনিবার) সকালে পুলিশ সুপারের নির্দেশে পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ফরিদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ওই ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গৃহকর্ত্রী জাহেদা আক্তার তিমু বলেন, ঘটনার দিন বিদ্যালয় থেকে ফিরে আমি বাসার ভেতরের দরজা বন্ধ পেয়েছি। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে ভবনের কেয়ারটেকার আবদুল হালিমের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। তখন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পাই। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
তবে ওই ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আত্মহত্যার আগের রাতে গৃহকর্ত্রী ও প্রিয়ার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রিয়াকে মারধরের অভিযোগও করেন। পুলিশ তাদের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন বলেন তারা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে একবার বাসা থেকে অভিমান করে বেরিয়ে যান প্রিয়া। পরে পরশুরাম ক্লিনিকের দক্ষিণ পাশে মনি নামে এক নারীর বাসায় অবস্থান করেন। তখন জাহেদা আক্তার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। পরে প্রিয়ার মা ফারজানা আক্তার ও খালা মনোয়ারা বেগম তাকে খুঁজে পেলেও তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হননি।
এদিকে নিহত প্রিয়ার সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিলিং ফ্যান থেকে মেঝের দূরত্ব ছিল প্রায় আট ফুট এবং মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ছিল নয় ফুট। ফ্যান থেকে গলার ফাঁসের গিঁট পর্যন্ত দূরত্ব ছিল প্রায় ৩০ ইঞ্চি। মেঝে থেকে প্রিয়ার পা ছিল প্রায় ১০ ইঞ্চি ওপরে। তার উচ্চতা আনুমানিক ৫৯ ইঞ্চি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রিয়ার শরীরে কোনো দৃশ্যমান জখম বা মারধরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থল থেকে ‘লাভ’ আকৃতির একটি লোহার পাত এবং একটি ডায়েরির কাগজে লেখা একটি চিরকুট জব্দ করেছে পুলিশ। চিরকুটে ইংরেজি বর্ণ ‘I’, তার নিচে ‘K+P’ এবং তার নিচে বাংলা ভাষায় ‘করেছি’ লেখা ছিল বলে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় থাকাকালে প্রিয়ার পায়ের নিচে মেঝেতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে সেটিকে ঋতুস্রাবজনিত (পিরিয়ডের) রক্ত বলে অনুমান করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বাম হাতে দুটি কাটা দাগ ছিল। প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, চামড়ায় কিছু লেখার চেষ্টা করা হয়েছিল। উদ্ধারকালে তার মাথায় হিজাব এবং শরীরে নতুন পোশাক ছিল।
তবে এসব আলামতের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সুরতহাল প্রতিবেদনে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। বিষয়গুলো তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনায় রেখেছে পুলিশ।
এদিকে প্রিয়ার মৃত্যুর পর ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গৃহকর্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ফুটেজে ধারণ হওয়া কিছু তথ্যের গড়মিল দেখা গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পরপর গৃহকর্ত্রী জাহেদা আক্তার তিমু দাবি করেছিলেন, ঘটনার দিন তিনি বাসার দরজায় তালা দিয়ে যাননি। কিন্তু ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ২৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে তিনি ফ্ল্যাটের বাইরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে চাবি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে ছেলে মাসরুরকে নিয়ে বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বের হন।
এর আগে ওইদিন সকাল ৬টা ৪৯ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে প্রিয়াকে ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখা যায়। তার হাতে কিছু একটি ছিল। প্রায় পাঁচ মিনিট পর সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে তিনি আবার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। এরপর তাকে আর বাইরে বের হতে দেখা যায়নি।
বিকেল ৫টা ১ মিনিটে বিদ্যালয় থেকে ফিরে জাহেদা আক্তার তিমুকে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালা খোলার চেষ্টা করতে দেখা যায়। পরে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় তিনি ভবনের কেয়ারটেকার আবদুল হালিমকে ডাকেন। এরপর ভবনের ব্যবস্থাপক সাদ্দাম হোসেন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারের (কার্তিকের হোটেল) কর্মচারী সুভাষ বলেন, ঘটনার দিন সকালে আমাদের দোকান থেকে চিনিগুড়া চাল কিনেছিলেন প্রিয়া।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রিয়া কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন না। এজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সম্ভাব্য প্রেমঘটিত সম্পর্কের গুঞ্জন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
একই ভবনের চতুর্থ তলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে বসবাসকারী সদ্য বদলি হওয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার মেয়ে তারিন বাশার লিমা বলেন, মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে আমি প্রায়ই দেখেছি, জাহেদা আক্তার তিমু বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় ফ্ল্যাটের বাইরের দরজায় তালা লাগিয়ে যেতেন।
প্রিয়ার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে অন্যের বাসায়। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে অভাবের সংসারের কারণে তাকে গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো হয়।
প্রথমে ফেনী শহরের স্কয়ার ল্যাবের ফারুকের ভাইয়ের বাসায় প্রায় সাত বছর ছিলেন তিনি। পরে মায়া আক্তার নামে এক নারীর মাধ্যমে পরশুরামের কেতরাঙ্গা মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জাহেদা আক্তার তিমুর বাসায় কাজ শুরু করেন। সেখানেই টানা প্রায় চার বছর ছিলেন।
প্রিয়ার খালা মনোয়ারা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে দূরে থাকায় তার মনে অভিমান তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনায় সেই অভিমান আরও গভীর হয়।
তিনি বলেন, গত রোজার ঈদের পর আমরা প্রিয়াকে দেখতে এসেছিলাম। সে আমার বুকে জড়িয়ে শুয়েছিল। কিন্তু নিজের মায়ের সঙ্গে একটি কথাও বলেনি।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০২১ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রিয়ার বাবা সাইফুল ইসলাম। পরে পরিবারের সম্মতিতে ফারজানা আক্তার দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বর্তমানে তার দ্বিতীয় সংসারে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলে সন্তান রয়েছে।
প্রিয়ার মৃত্যুর পর আরেকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার স্বজনেরা। তাদের দাবি, প্রায় চার বছর গৃহকর্মীর কাজ করলেও এই সময়ের কোনো পারিশ্রমিক পরিবার হাতে পায়নি। প্রিয়ার খালা মনোয়ারা বেগম বলেন, মৃত্যুর পরদিন রাতে থানায় বসে চার বছরের পারিশ্রমিক বাবদ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, প্রিয়াকে জাহেদা আক্তার লেখাপড়া করানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাকে কখনো স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি। চার বছরের মজুরি মাত্র ৫০ হাজার টাকা কীভাবে নির্ধারণ করা হলো, সেটিও আমাদের বোধগম্য নয়।
মনোয়ারা বেগম আরও বলেন, প্রিয়াকে পরশুরামে কাজে পাঠানোর সময় তার কাছে একটি স্বর্ণের কানের দুল ও একটি নাকফুল ছিল। মৃত্যুর পর ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে ওই অলংকারও পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চিরকুটের লেখাগুলো প্রিয়ার নিজের লেখা কি না, সেটি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার দাবি, বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য বা আত্মহত্যায় প্ররোচনার ঘটনা রয়েছে-সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তদন্তে যেটি উঠে আসবে, সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, ঘটনাটি ঘিরে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ, সুরতহাল প্রতিবেদন, আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন-সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই কেবল প্রিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
আরকে
