বিজ্ঞাপন

শিশুদের নতুন স্বপ্নের ঠিকানা

শিক্ষাবঞ্চিত গ্রামে তরুণদের উদ্যোগে মাটি-বাঁশের এক ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়

শিক্ষাবঞ্চিত গ্রামে তরুণদের উদ্যোগে মাটি-বাঁশের এক ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়

বাঁশের তৈরি প্রধান ফটক। কক্ষের দেয়ালগুলো ২০ ইঞ্চি পুরু করে মাটি দিয়ে তৈরি, ছাউনিতে ব্যবহার হয়েছে মাটির টালি, মেঝেও মাটির। দরজা বাঁশের আর জানালা বেতের। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বসার চেয়ার-টেবিলও তৈরি হয়েছে বাঁশ দিয়ে। মাঠে থাকা দোলনাটিও বাঁশ দিয়ে তৈরি।

প্রাকৃতিক সব উপাদান দিয়ে তৈরি স্থাপনাটি মূলত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয়টির নাম ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’। স্থানীয় শিক্ষিত কিছু তরুণের উদ্যোগে মাটি, বাঁশ আর স্থানীয়দের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টি এখন গ্রামের শিশুদের কাছে নতুন স্বপ্নের ঠিকানা। এরই মধ্যে মাটির তৈরি দৃষ্টিনন্দন এই বিদ্যালয়টি নজর কেড়েছে অনেকের।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে রাধাকানাই ইউনিয়নের রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়া গ্রাম। আখালিয়া নদী ও ফুতালারা বিলের তীরবর্তী এই গ্রামে এক সময় শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। সবচেয়ে কাছের রঘুনাথপুর মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও গ্রাম থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে।

দূরত্ব কম হলেও বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রধান অন্তরায় হলো যাতায়াতের কাঁচা পথ। বর্ষায় সেই পথ হয়ে ওঠে পিচ্ছিল ও কাদাময়। ফলে ছোট ছোট শিশুদের কাদা ভরা রাস্তা পেরিয়ে দুই কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। এ কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী ছিলেন না। ছোট শিশু ও মেয়েদের একটি বড় অংশ দেরিতে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো, কেউ কেউ একেবারেই বিদ্যালয়ে যায়নি। ফলে গ্রামের স্বাক্ষরতার হারও ছিল নিম্নমুখী। গত বছর থেকে পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হওয়ার পর বদলাতে শুরু করেছে গ্রামের সেই চিত্র।

বিদ্যালয়টি নিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আমির হামজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জীবনে ইস্কুলে গিয়ে দেহি নাই। এলাকার রাস্তার সমস্যার কারণে ইস্কুলে পোলাপান পাঠানো হয় না। আঙ্গর (আমাদের) মতো কপালপোড়া মানুষ দেশে নাই। এখন এই ইস্কুলে এলাকার পোলাপান পড়ালেখা করতাছে।’

গ্রামটিতে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষিত কয়েকজন তরুণ। তারা যোগাযোগ করেন ঢাকাভিত্তিক গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থার সঙ্গে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও শেখার সুযোগ বাড়াতে কাজ করে সংস্থাটি। পাহাড়িয়াপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘরের আদলেই বিদ্যালয়টি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।

স্থানীয় সুমন নামে এক তরুণ বিদ্যালয় তৈরির জন্য জমি দিয়েছেন। ২০২৪ সালে গ্রামের কেউ নিজের ঝাড় থেকে বাঁশ দিয়ে, কেউ জমির মাটি কেটে, আবার কেউ শ্রম ও সময় দিয়ে সহযোগিতা করেন। বিদ্যালয়টি নির্মাণে শ্রমিকের খরচ দিয়ে সহায়তা করেছে বেসরকারি সংস্থাটি। এরপর ২০২৫ সাল থেকে শুরু হয় পাঠ কার্যক্রম।

বিদ্যালয়টির সমন্বয়ক সেলিম আহমেদ বলেন, ‘এলাকার কিছু তরুণ মিলে স্কুল করার পরিকল্পনা নিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তরুণদের উৎসাহে গ্রামবাসীদের নিয়ে স্কুলটি করেছি। আমাদের এলাকার ঐতিহ্য হচ্ছে মাটির ঘর। তাই স্কুলটিও মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। স্কুলের বেঞ্চগুলোও বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের ব্যাগগুলোও পাট দিয়ে তৈরি। স্থানীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমরা স্কুলটিকে চালাচ্ছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আগে স্কুল না থাকায় এলাকার পাঁচ শতাংশ শিশুরও পড়ালেখার সুযোগ ছিল না। এখন যেহেতু কাছে স্কুল হয়েছে, তাই সবাই স্কুলে আসতে শুরু করেছে।’

কম খরচে, পরিবেশবান্ধব বিদ্যালয় নির্মাণ

পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল শুধু শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে না, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব নির্মাণেরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাদিয়া জাফরিন বলেন, ‘মাটির স্কুল দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত বাধা দূর করার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল ও স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর একটি সমাধান হিসেবে গড়ে উঠছে।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টি নির্মাণে ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। এভাবে প্রায় ২ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো গেছে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরের তাপমাত্রা প্রচলিত ভবনের তুলনায় প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। একই সঙ্গে আর্দ্রতার মাত্রাও প্রচলিত ভবনের তুলনায় কম।

সম্প্রতি পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাটির তৈরি নান্দনিক বিদ্যালয়টিতে চলছে পাঠ কার্যক্রম। গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যালয়টিতে স্থানীয় শক্তিকেই বেশি কাজে লাগানো হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষকেরা আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের পাঠদান করছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। বর্তমানে এখানে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠদান চলছে। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৮।

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম আক্তারের কাছে এই বিদ্যালয় যেন নতুন এক সুযোগের নাম। সে বলে, ‘আগে ইস্কুল দূরে আছিল, হেই জন্য ইস্কুলে পড়তাম না। এলাকায় মাদরাসা আছিল, সেইখানে পড়তাম। এহন এই ইস্কুলে পড়ি। এই ইস্কুলটা অনেক ভালো, স্যারেরা অনেক মজা কইরা পড়ায়। আমি পড়ালেখা কইরা ডাক্তার হইতে চাই।’

আরেক শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামও আগে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পড়তে যেত না। বিদ্যালয় দূরে হওয়ায় তার মা-বাবাও তাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন না। এখন বাড়ির কাছেই বিদ্যালয় হওয়ায় নিয়মিত যায় সে।

রাধাকানাই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘এলাকাটিতে বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা পড়ালেখা করতে পারত না। এতে নিরক্ষর হয়ে শিশুরা বেড়ে উঠছিল। বিদ্যালয়টি হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে পাশাপাশি এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়াও খুবই প্রয়োজন।’

বর্তমানে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নেওয়া হয়। প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ১২০ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৪০ টাকা করে নেওয়া হয়। শিক্ষকদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন এবং সংস্থাটির সহায়তায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এই বিদ্যালয় তৈরিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা পরিবারগুলোর একটি পাহাড়িয়াপাড়ার সুমন মিয়ার পরিবার। ডিগ্রি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন নিজের বাড়ির পাশে বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য পরিবারের ২৬ শতক জমি দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ নিতে দেখা যায় সুমন মিয়াকে। নিজের এলাকার শিশুদের শিক্ষাবঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার শিশুরা বড় হয়ে স্কুলে যায়, রাস্তার সমস্যা থাকার কারণে ছোট বেলায় স্কুলে যেতে পারে না। স্কুলটি করাতে যে সব বাচ্চারা আগে স্কুলে যেতে ভয় পেত, তাদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে আমাদের স্কুলে নিয়ে এসেছি। বাচ্চারাও পড়ালেখায় অনেক আগ্রহী। গ্রামে শিক্ষার যে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, সেটা কেটে যাক। ধীরে ধীরে স্কুলটি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা নিয়ে যাব।’

ফুলবাড়িয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, বিষয়টি আমি অবগত না। যেহেতু উনারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন, যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তবে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।

একসময় যে গ্রামের শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ছিল সবচেয়ে বড় বাধা কাদা, দূরত্ব আর অনাগ্রহ, সেই গ্রামের মাটির উঠানেই এখন তৈরি হচ্ছে নতুন আগামী স্বপ্ন। 

সাখাওয়াত সুমন/আরকে