বিজ্ঞাপন

পুরোনো সড়কের ইট-বালুতে নতুন সড়ক নির্মাণের অভিযোগ এলজিইডির বিরুদ্ধে

পুরোনো সড়কের ইট-বালুতে নতুন সড়ক নির্মাণের অভিযোগ এলজিইডির বিরুদ্ধে

নতুন সড়ক নির্মাণের নামে ভেঙে ফেলা হয়েছে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের একটি পাকা সড়ক। ওই সড়কের ইট, বালু ও কার্পেটিং তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে নতুন সড়ক নির্মাণে। এ বিষয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি, দেওয়া হয়নি কোনো ক্ষতিপূরণও। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন সড়ক নির্মাণেও নির্ধারিত শর্ত না মেনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুর বদলে কাদামাটি, নির্ধারিত খোয়ার পরিবর্তে ভবনের রাবিশ ও ইটের গুঁড়া, আর এক নম্বর ইটের জায়গায় নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে সড়ক নির্মাণকাজে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইকপাড়া-কৃষ্ণপুর সড়ক নির্মাণে পাঁচ কোটি চৌষট্টি লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। দরপত্রে বারো শতাংশ কম দর (লেস) দিয়ে কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাবর ট্রেডার্স। পরে কাজটি আরও কম দরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত সুভান বিডিআর ও বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমের কাছে সাব-ঠিকাদারি হিসেবে হস্তান্তর করা হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাদারগঞ্জ এলাকায় ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রসংলগ্ন ঠাকুরগাঁও চিনিকলের একটি পাকা সড়কের অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙা সড়কের ইট, বালু ও কার্পেটিংয়ের উপকরণ খননযন্ত্র ও ট্রাকে করে নতুন সড়ক নির্মাণস্থলে নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। সড়কের মালামালের কোনো মূল্য সরকারি হিসাব থেকে সমন্বয় করা হয়নি, চিনিকল কর্তৃপক্ষও পায়নি কোনো ক্ষতিপূরণ। প্রকাশ্যে এ কাজ হলেও বিষয়টি জানে না ঠাকুরগাঁও চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহান কবির বলেন, আমি আগে এই বিষয়ে কিছু জানতাম না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এলজিইডির ঠিকাদার চিনিকলের সড়ক ভেঙেছে। যদিও আমার কাছে কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া হয়নি। আমাদের সড়ক যদি অন্য কেউ ভাঙতে চায়, তাহলে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক নিয়মে অনুমতি নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমতি দিলেও সেই সড়কের প্রতি টুকরো ইট পর্যন্ত আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে তারা মালামাল দেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, আমাদের চোখের সামনেই সড়ক ভেঙে নিয়ে গেছে। যে সড়ক আগে ছিল, সেটাই কেটে তুলে আবার নতুন সড়কের কাজে ব্যবহার করছে। সরকারি সম্পদ এভাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। শুধু পুরোনো সড়কের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগই নয়, নতুন সড়ক নির্মাণেও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাব-বেস ও বেস নির্মাণে মানসম্মত বালুর পরিবর্তে কাদামাটিযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এক নম্বর ইটের পরিবর্তে নিম্নমানের ও ঝামা ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্ধারিত আকারের ইটের খোয়ার বদলে ভবন ভাঙার রাবিশ ও ইটের গুঁড়া ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এলজিইডির সড়ক নির্মাণ নির্দেশিকা অনুযায়ী সড়কের দুই পাশে মাটির শোল্ডার রাখার কথা থাকলেও অনেক স্থানে তা রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নির্মাণাধীন সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
 
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চোখের সামনে এত বড় অনিয়ম হলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। দুই দলের দুই প্রভাবশালী নেতা মিলে এই কাজ করায় প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। যোগাযোগের সুবিধার্থে নতুন সড়ক তৈরি করতে গিয়ে উল্টো চিনিকলের পুরোনো চলাচলের সড়কটিও নষ্ট করা হয়েছে।

স্থানীয়রা বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস ও সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাবুদ হোসেন প্রায় দিনে নির্মাণকাজ পরিদর্শনে আসতেন। তাদের কয়েকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেননি। আমরা মনে করি তাদের যোগসাজশেই সড়কের কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্মাণকাজে উপস্থিত সাব-ঠিকাদাররা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

কাজের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাবর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ফয়জুর রহমান বলেন, কাজটি সাব-ঠিকাদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তারা কীভাবে কাজ করছে, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাবুদ হোসেন বলেন, 'বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যস্ততার কারণে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা কাজটি নিয়মিত তদারকি করতে পারেননি।

আর এলজিইডি ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস বলেন, ছবি ও ভিডিও দেখে বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছি। সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগ তদন্ত করা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেদওয়ান মিলন/আরএআর

বিজ্ঞাপন