বিজ্ঞাপন

৪ মাস ধরে বন্ধ সরকারি সি-ট্রাক, ডেঞ্জার জোনে অবৈধ ট্রলারে যাতায়াত

৪ মাস ধরে বন্ধ সরকারি সি-ট্রাক, ডেঞ্জার জোনে অবৈধ ট্রলারে যাতায়াত

নৌপথে ভোলার মূল ভুখণ্ডের সাথে মনপুরা উপজেলার প্রায় দেড়লাখ বাসিন্দার নিরাপদে চলাচলের একমাত্র বাহন ‘এসটি ইলিশা’ নামে সরকারি সি-ট্রাকটি গত ৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এটি বন্ধ থাকায় উত্তাল মেঘনায় ডেঞ্জার জোনে বাধ্য হয়েই প্রতিদিনই মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ ট্রলারে যাতায়াত করতে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছেন উপজেলাবাসী। তবে শিগগিরই সি-ট্রাকটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী।

অভিযোগ উঠেছে, মেঘনা নদীর ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ব্যতীত যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হলেও অবৈধ ট্রলার যাত্রী পারাপার করছে মাসের পর মাস। এসব অবৈধ যাত্রীবাহী ট্রলারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না ভোলা বিআইডব্লিউটিএ।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, তজুমদ্দিন থেকে মনপুরা নৌরুটে যাত্রীদের নিরাপদে মেঘনা পারাপারের জন্য এসটি ইলিশা নামের একটি সি-ট্রাক বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। এতে প্রতিদিনই নিরাপদে এবং স্বস্তিতে মেঘনা নদী পাড়ি দিত মনপুরাবাসী। কিন্তু চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি বিকল হয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং এরমধ্যেই সরকারিভাবে বাতিল করে সি-ট্রাকটির ইজারা। 

এছাড়া সরকারের নির্দেশনা রয়েছে, চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে বা বে ক্রুসিং সনদ ছাড়া কোনো নৌযানে যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। এ সময়ে মেঘনা নদী বেশ উত্তাল থাকে। কিন্তু সরকারের এ নির্দেশনা উপক্ষো করে মনপুরা–তজুমদ্দিন নৌরুটে ট্রলারে যাত্রী পারাপার করছে বিভিন্ন ব্যক্তিরা। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ নৌযানে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে, গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়াও।

সরেজমিনে তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, এ ঘাটটি মূলত মনপুরা উপজেলার বাসিন্দাদের চলাচলের সহজ যোগাযোগ মাধ্যম। মনপুরা থেকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে খোন্দলের মধ্যে করে শতাধিক যাত্রী নিয়ে উত্তাল মেঘনার বড় বড় ঢেউ কোনোমতে পাড়ি দিয়ে তজুমদ্দিন ঘাটে আসে একটি পণ্য পরিবহনের ট্রলার। এর কিছুক্ষণ পরেই আসে আরেকটি ট্রলার। এসবের নেই কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট বা যাত্রী পরিবহনের অনুমতি। তারপরও গত ৩মাস ধরে এভাবেই যাত্রী পরিবহন করে আসছে অবৈধ অন্তত ৭টি ট্রলার। এসব ট্রলারে নেই যাত্রীদের জীবন রক্ষাকারী নিরাপত্তা সরঞ্জামও। 

মনপুরাগামী নাছির উদ্দিন, সফিউল্লাহ, মাকসুদ বেপারী ও মহিউদ্দিন বলেন, মেঘনা নদী বেশ উত্তাল, প্রয়োজনর তাগিদে ট্রলারে উঠলে মনে হয় আজই জীবনের শেষ দিন। তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে টানা গত ৩মাস ধরে সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে আমরা সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছি। সি-ট্রাকের যাতায়াত হচ্ছে নিরাপদ। সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় আমাদের বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মালবাহী ট্রলারে করে মনপুরায় আসা যাওয়া করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুরা। কোনো সময়ে যাত্রীরা বৃষ্টিতে ভিজতে যায়, আবার কোনো সময়ে তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করে। আবার কোনো কোনো সময় মাঝ নদীতে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

যাত্রী মো.জসিম, ইয়াছিন ও কামাল বলেন, নদীতে বড় বড় ঢেউ আর ট্রলারের দুরাবস্থা দেখে ট্রলারে উঠতে সাহস পাচ্ছি না। মনপুরার প্রতিটি মানুষ জীবনের ঝঁকি নিয়ে প্রতিদিন এভাবেই যাতায়াত করছেন। বাধ্য হয়েই ট্রলারে চড়ে মনপুরা যাচ্ছি। প্রায়ই দেখি মাঝ মেঘনা নদীতে ঝড় শুরু হলে নারী শিশুসহ যাত্রীদের কান্নার রোল পড়ে যায়। ট্রলার প্রচণ্ড রোলিং করে, এপাশ ওপাশ করে দোলে। কিছু করার নাই, যেতেই হবে। 

ভোলা সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী মো. বাবুল ও মমিন বলেন, ভোলা সদর থেকে জরুরি পারিবারিক কাজে মনপুরায় নিজ বাড়িতে যাওয়ার জন্য তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে এসে দেখি, সি-ট্রাক নেই। পরে জানলাম সেটি এখন আর চলে না। তাই ট্রলারে চড়ে মনপুরার উদ্দেশ্যে রওনা দেই, মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়তে হয়েছে। ট্রলারে যাত্রীদের নিরাপত্তায় কোনো বয়া বা সরঞ্জাম ছিল না। বলা চলে ট্রলার নিজেই ঝুঁকিপুর্ণ। আজকে যখন কাজ শেষে মনপুরা থেকে ফের ভোলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, তখন মাঝ নদীতে হঠাৎ বৃষ্টির কবলে পড়ে পুরো ভিজে গিয়েছি। সি-ট্রাক না থাকায় চরম ভোগান্তি হচ্ছে, যা দেখার কেউ নেই। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে দায়ভার কে নেবে? 

পরিবার নিয়ে মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে আসা দিপা রানী ও সুমন বলেন, ট্রলারে যাতায়াত চরম ভোগান্তির। তারপরও গত কয়েকমাস ধরে বাধ্য হয়েই মনপুরার বাসিন্দারা যাতায়াত করছেন। ট্রলার যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে। আমরা আমাদের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে বাধ্য হয়েই ট্রলারে চড়ে যাতায়াত করছি। আমরা চাই অতিদ্রুত যেন নিরাপদ বাহন সি-ট্রাকটি চালু করা হয়।

তজুমদ্দিন-মনপুরা নৌরুটের সরকারি সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি ভোলা সফরে আসা নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান জানিয়েছেন, নৌপথে নাগরিকদের ভোগান্তি লাঘবে সরকারি বা বেসরকারিভাবে যেখান থেকে সম্ভব জাহাজ দেওয়াসহ সবধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নৌপথে নাগরিকদের ভোগান্তির শিকার হতে দেব না।

বিআইডব্লিউটিসির ভোলা (ইলিশা) ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ খান বলেন, প্রথমে যান্ত্রিক ত্রুটি, এরপর ইজারা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি চলাচল বন্ধ রয়েছে। নতুন করে ইজারা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে সি-ট্রাকটি চালু হবে।

এদিকে তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে মেঘনা নদীর ডেঞ্জার জোনে অবৈধভাবে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচলের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন বিআইডব্লিউটিএ এর ভোলা নদী বন্দরের সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা নির্মল কুমার রায়। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভোলায় বিআইডব্লিউটিসির মোট ৫টি সি-ট্রাক রয়েছে। এরমধ্যে ৪টি চলাচল করে ইলিশা-লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাট নৌরুটে। বাকি একটি ছিল তজুমদ্দিন-মনপুরা নৌরুটে, দ্রুত বন্ধ থাকা সি-ট্রাকটি চালুর দাবি মনপুরাবাসীর।

মো.খাইরুল ইসলাম/এসএইচএ

বিজ্ঞাপন