পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজে ব্যবহারের অভিযোগে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। অভিযানে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করে বিনষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এভাবে সমুদ্রসৈকত থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রোববার (২৬ জুলাই) মধ্যরাতে কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেকের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে লেম্বুরবন পর্যন্ত নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজে ব্যবহারের জন্য খাজুরা গ্রামের জোমাদ্দার বাড়ি সংলগ্ন ১৮ ঘর পয়েন্ট এলাকায় সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি চলছিল। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়রা বাধা দিলেও তা উপেক্ষা করে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, যে স্থান থেকে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, সেই অংশে শহর রক্ষা বাঁধের সিসি ব্লকের বেশ কয়েকটি অংশ আগেই সরে গেছে। সেখানে আবার বালু উত্তোলন করা হলে বাঁধের নিচের ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং উপকূল রক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি শতভাগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এতে জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কুয়াকাটা শহরের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযানের সময় বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কোনো শ্রমিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে থাকা অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করে বিনষ্ট করা হয়, যাতে পুনরায় এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা না যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আমরা কাজের সঙ্গে জড়িত লোকজনকে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন না করার জন্য নিষেধ করেছিলাম। তখন তারা আমাদের বলেন, ‘প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের ম্যানেজ করেই কাজ করছি, আপনারা কিছুই করতে পারবেন না।’ এমন বক্তব্যে আমরা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মেরিন ড্রাইভ সড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা হোক। তবে কোনোভাবেই সমুদ্রসৈকত ধ্বংস করে বা অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের মাধ্যমে নয়। কারণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ চলাচল করেন। উন্নয়নের নামে পরিবেশ ও উপকূলীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, এর আগেও একইভাবে সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে এই সড়কের নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়। কিন্তু আবারও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
কুয়াকাটা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুসাইন আমির বলেছেন, এমনিতেই কুয়াকাটার শহর রক্ষা বাঁধের অন্তত তিনটি স্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ঝুঁকি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ প্রকাশ ও সচেতনতা তৈরির কাজ করছি। এর মধ্যে আবার সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, উপকূল রক্ষায় নির্মিত তীররক্ষা বাঁধের পাশ থেকে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক বলেছেন, অনিয়মের সংবাদ পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করি। তবে সেখানে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে থাকা অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করে বিনষ্ট করা হয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় পরিবেশ ও সমুদ্রসৈকত রক্ষায় অবৈধ বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে চলমান থাকবে।
এসএম আলমাস/এসএইচএ
