বিজ্ঞাপন

শখের খেলায় যে হাটে কোটি টাকার বাণিজ্য

শখের খেলায় যে হাটে কোটি টাকার বাণিজ্য

রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী বাজার। এটি পৌরসভা এলাকা। এক সময়ের গ্রামীণ পরিবেশ হওয়ায় এটি ‘কাটাখালী হাট’ নামেও অনেকের কাছে এখনো পরিচিত। ছোট্ট এই হাট-বাজারে অন্য সব দোকানের সঙ্গে খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রির দোকান (ক্রীড়াসামগ্রী ও পোশাকের দোকান) রয়েছে ১০টি। দোকানগুলোতে শখের খেলাধুলার সামগ্রী কেনাবেচায় বছরে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। স্থানীয় দুটি ফুটবল ও একটি ক্রিকেট একাডেমির খেলোয়াড় ছাড়াও বিভিন্ন জেলার সব বয়সের ক্রেতা রয়েছে তাদের।

২০০৮ সালের দিকে কাটাখালী পৌরসভার পূর্বে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পাশে ‘বাংলা ট্রাক ক্রিকেট একাডেমি’ চালু করা হয়। সেই বছরেই কাটাখালী বাজারে ওই একাডেমির একটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান দেওয়া হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘কাটাখালী স্পোর্টস’। তারও আগে থেকে জুটমিলস মাঠে স্থানীয় ও আশপাশের তরুণদের নিয়ে নিয়মিত চলত ‘কাটাখালী ফুটবল একাডেমি’। এ ছাড়া এই পৌরসভার হরিয়ান বাজার এলাকায় রয়েছে হরিয়ান ফুটবল একাডেমি, যা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অধীন। এই তিন একাডেমির খেলোয়াড়দের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে কাটাখালীতে ক্রীড়াসামগ্রীর ব্যবসা শুরু হয়।

দোকানিদের কয়েকজন বলছেন, রাজশাহী শিক্ষানগরী। এই শহরে রয়েছে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী একসময় সামান্য পরিমাণে মিলত কাটাখালীতে। দিনে দিনে কাটাখালীতে বাড়তে থাকে এসব দোকান। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্রীড়াসামগ্রী কেন্দ্রিক কেনাবেচা। কাটাখালীর জুটমিলস গেট থেকে হাই স্কুল মার্কেট পর্যন্ত বিভিন্ন নামে ১০টি দোকান রয়েছে, যেখানে খেলোয়াড়দের জার্সিসহ খেলাধুলার সব ধরনের সামগ্রী পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় অর্ডার নিয়ে স্থানীয় দুটি পোশাক কারখানা ছাড়াও ঢাকা থেকে জার্সি তৈরি করে আনা হয়।

দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাটাখালী স্পোর্টস, এমএম স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস, সাকিল স্পোর্টস, জননী স্পোর্টস, শারিম স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস, হৃদয় স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস, কাইয়ুম খেলাঘর, সজিব স্পোর্টস, নয়ন স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস ও নিউ টি-টোয়েন্টি স্পোর্টস। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে নাইক স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস এবং মনি স্পোর্টস অ্যান্ড গার্মেন্টস। কাইয়ুম খেলাঘর ও সজিব স্পোর্টসে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়। দোকানগুলোতে সারা বছর কেনাবেচা চললেও মূলত দুই ঈদ ও দীর্ঘ ছুটিতে বেশি চাপ থাকে, কারণ এই সময়ে এলাকাভিত্তিক ছোট-বড় টুর্নামেন্টে জার্সিসহ খেলার সামগ্রী বেশি বিক্রি হয়।

সজিব স্পোর্টসে কথা হয় ক্রেতা মাকসুদুল করিম সম্রাটের সঙ্গে। তিনি কাটাখালীতে ফুটবল প্রশিক্ষণার্থী। তিনি বলেন, কাটাখালী ছোট একটা বাজার হলেও এখানে রয়েছে ১০টির বেশি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান। আমার জানামতে রাজশাহী বিভাগের কোথাও এত দোকান নেই। 

প্রায় সব দোকানেই কমবেশি ভালো কেনাবেচা হয় বছরজুড়ে। এ কারণে কাটাখালীকেন্দ্রিক একটি ক্রিকেট ও দুটি ফুটবল একাডেমি রয়েছে। এসব একাডেমিতে প্রায় এক হাজার খেলোয়াড় প্রশিক্ষণ নেন। দোকানগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা তারাই। এ ছাড়া আশপাশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রীও মেলে কাটাখালীতে।

লিখন ইসলাম বলেন, ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপ ছাড়াও বিপিএল ও আইপিএলের মতো ছোট আসরেও জার্সি প্রচুর বিক্রি হয়। এ ছাড়া দুই ঈদ ও দীর্ঘ ছুটিতে বেশি চাপ থাকে এখানে। গত দুই ঈদে আমাদের এলাকায় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল। দুইবারই নতুন জার্সি ছিল। কাপ, মেডেল, বল, ক্রিকেট ব্যাট—সবই কাটাখালী থেকে নেওয়া। 

তিনি জানান, তারা ঈদের পাঁচ থেকে সাত দিন আগে জার্সি তৈরির অর্ডার নেন না। সেই সময় এলাকাভিত্তিক ছোট-বড় টুর্নামেন্টে দলীয় জার্সি তৈরির হিড়িক পড়ে যায় দোকানগুলোতে। কিছু জার্সি স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়, কিছু ঢাকা থেকে আনা হয়—দাম ও মানে তারতম্য থাকে সে অনুযায়ী।

বাংলা ট্রাক ক্রিকেট একাডেমির একজন খেলোয়াড় জানান, কাটাখালীতে সব ধরনের খেলার সামগ্রী পাওয়া যায় এবং এখানে কয়েকটি ক্রিকেট একাডেমি রয়েছে। রাজশাহীর ছোট ছোট টুর্নামেন্টেও দলীয় জার্সি তৈরি করা হয়।

সম্প্রতি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মাসকাটাদিঘীতে একটি টার্ফের মাঠ স্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে শহরের উত্তর পাশে বিহাস থেকে বিমানচত্বর পর্যন্ত সড়কের মধ্যে গ্রামীণ পরিবেশঘেরা নাদের হাজীর মোড়ে তিনশ থেকে চারশ মিটারের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি টার্ফের মাঠ। মোট ছয়টি টার্ফের মাঠ ও দুটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বছরজুড়ে ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্ট থাকায় প্রতিনিয়ত জার্সি ও খেলার সামগ্রীর অর্ডার পান এখানকার দোকানমালিকরা।

প্লে ল্যান্ড টার্ফের উদ্যোক্তা মো. জাহিদ হাসান বলেন, আমরা আরও বড় পরিসরে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা করছি, যাতে আরও বেশি মানুষ খেলাধুলার সুযোগ পায়। 

ইনডোর পার্ক টার্ফের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সজীব ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রজন্ম মুঠোফোনের প্রতি বেশি আসক্ত। আমরা চেয়েছি তাদের খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনতে। এখানে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিসসহ নানা ধরনের খেলার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে একে অপরকে দেখে সবাই উৎসাহ পায়।

ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহীর কাটাখালী অঞ্চলে ক্রীড়া সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। এই অঞ্চলে ক্রীড়াচর্চা শারীরিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবেও গড়ে উঠেছে। খেলাধুলার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক প্রসারের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। কাটাখালীর আশপাশে টার্ফ ও ক্রীড়া একাডেমি গড়ে ওঠায় স্থানীয় ব্যবসাও প্রসার লাভ করেছে। রাজশাহী শহরে বেশ কিছু পরিচিত ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান থাকলেও দামের পার্থক্যের কারণে শহরের ক্রেতারাও আসেন কাটাখালীতে।

কাটাখালীর দোকানগুলোতে ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য ফুটবল, গোলপোস্ট, জার্সি, শর্টস, মোজা, বুট, শিন গার্ড পাওয়া যায়। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জন্য ব্যাট, বল, স্টাম্প, উইকেটকিপিং গ্লাভস, হেলমেট, প্যাড পাওয়া যায়। টেনিসের জন্য র‌্যাকেট, বল, জাল, জার্সি, শর্টস, ব্যাডমিন্টনের জন্য র‌্যাকেট, শাটলকক, জাল, জার্সি, শর্টস, সাঁতারের জন্য পোশাক, টুপি, চশমা, ইয়ারপ্লাগ এবং জিমের জন্য ডাম্বেল, বারবেল, ট্রেডমিল, স্টেশনারি বাইক, ম্যাট পাওয়া যায়।

২০১৩ সালে সজিব স্পোর্টস যাত্রা শুরু করে কাটাখালীতে। প্রতিষ্ঠানটির সেলস ম্যানেজার রবিউল আওয়াল নয়ন বলেন, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার কেনাবেচা হয়। ধরনভেদে তিন হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের সামগ্রী বিক্রি হয়। মালামাল কেনা হয় ঢাকা থেকে। আমাদের ক্রেতার ৩০ শতাংশ শহর থেকে আসেন। রাজশাহীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও খেলাধুলার জিনিসপত্র কিনতে আসেন। এ ছাড়া টার্ফগুলোও এখান থেকে ক্রীড়াসামগ্রী কেনে।

তিনি আরও বলেন, কাটাখালীতে দুটি কারখানা আছে। অনেকে ঢাকা থেকেও বানিয়ে নেন, তবে ক্রেতা তেমন পার্থক্য বোঝেন না। সময় কম থাকলে স্থানীয়ভাবেই তৈরি করে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপের মতো বড় আসর ছাড়াও মৌসুমে ভালো চাহিদা থাকে, ঈদের সময়েও চাপ থাকে বেশি।

কাইয়ুম খেলাঘরের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ এলাহী বলেন, দোকানটি ২০১৪ সালের শুরুর দিকে চালু হয়। আমাদের ক্রেতার ৮০ শতাংশ শহরের। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁর ক্রেতারাও আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও কাটাখালীতে আসেন।

কাটাখালী অঞ্চলের ক্রীড়া অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্য। নাদের হাজীর মোড়ের ঘনবসতিপূর্ণ টার্ফগুলো এই বাজারের চাহিদা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই অঞ্চলের দোকানগুলোতে প্রতি মাসে সম্মিলিতভাবে লাখ টাকার বেশি ক্রীড়াসামগ্রী কেনাবেচা হয় বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কাটাখালী বাজার সমিতির আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমিতির একজন সদস্য জানান, কাটাখালীতে ক্রীড়াসামগ্রীর অনেকগুলো দোকান রয়েছে। তাদের ব্যবসা ভালোই হয়। কয়েকজনের দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার কেনাবেচা হয়। সেই হিসাবে ১০টি দোকান মিলিয়ে বছরে কোটি টাকার কেনাবেচা হয়।

হরিয়ান ফুটবল একাডেমির সহকারী প্রশিক্ষক মামুন হোসেন বলেন, কাটাখালীতে সব ধরনের খেলার সামগ্রী পাওয়া যায়। আমাদের একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরা কাটাখালী থেকেই যাবতীয় জিনিসপত্র কেনেন। এতে একদিকে শহরে যাওয়া-আসার খরচ বাঁচে, অন্যদিকে দামও কম পড়ে।

কাটাখালী ফুটবল একাডেমির প্রশিক্ষক আকতারুজ্জামান বুলেট জানান, কাটাখালী থেকে অনেক ভালো খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে। এই এলাকা ক্রীড়াসামগ্রীর জন্য সমৃদ্ধ। ছেলেরা তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিসপত্র এখানেই পায়।

শাহিনুল আশিক/আরএআর

বিজ্ঞাপন